জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান পৃথিবীর বাস্তব সংকট। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির ওপর ক্রমেই গভীর চাপ তৈরি করছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে যেসব দেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম, অনেক সময় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ তার বড় উদাহরণ।
ভৌগোলিক অবস্থান, ঘন জনবসতি, দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি বহুমাত্রিক। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমপরিমাণ বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সভায় উল্লেখ করেছেন। ফলে জলবায়ু সংকট বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, উন্নয়নের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে জলবায়ু পরিবর্তন ও ন্যায়সংগত রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রথমটি হলো— প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো। দ্বিতীয়ত জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অভিযোজন অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তিতে অধিকতর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। চতুর্থত সহজলভ্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো। পঞ্চমত ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন ও নিয়মিত অর্থ পুনঃপূরণ নিশ্চিত করা।
প্রথম দাবিটির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৈশ্বিক তাপমাত্রা যত বাড়বে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, চরম আবহাওয়া, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিও তত বাড়বে। এর অভিঘাত পড়বে কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, আবাসন ও মানুষের জীবিকায়। জাতিসংঘও সতর্ক করেছে যে বিশ্ব ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমার সাময়িক অতিক্রমের দিকে এগোচ্ছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
দ্বিতীয় দাবিটি অভিযোজন অর্থায়ন নিয়ে। বাঁধ নির্মাণ, নদী ও খাল পুনর্খনন, পানি সংরক্ষণ, লবণাক্ততা মোকাবিলা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের চলতি বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সীমিত সম্পদের একটি উন্নয়নশীল দেশ নিজস্ব অর্থে এত বড় বিনিয়োগ করছে, অথচ বৈশ্বিক নিঃসরণে তার অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। তাই অভিযোজন অর্থায়নকে সহজলভ্য, দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় করা জলবায়ু ন্যায্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তৃতীয় দাবির সঙ্গে প্রযুক্তির বিষয়টি যুক্ত। উন্নত বীজ, পানি সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রযুক্তি থাকলেই তার সুফল পাওয়া যায় না। মূল্য, দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও জ্ঞানগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে এসব প্রযুক্তি নাগালের বাইরে থেকে যায়। তাই প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
চতুর্থ দাবিটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি সবুজ শিল্প, পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে
জ্বালানি, সার্কুলার অর্থনীতি এবং জাতীয় কার্বন বাজারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে এ লক্ষ্য
অর্জনে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
পঞ্চম দাবি হলো ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অর্থ পুনঃপূরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের সব ক্ষতি অভিযোজনের মাধ্যমে ঠেকানো যায় না। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে কোনো এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়লে ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে না। হারাতে পারে জীবিকা, স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বাংলাদেশের জন্য তাই ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল কোনো বিমূর্ত কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি সম্ভাব্য বাস্তুচ্যুতি, জীবিকা হারানো, ভূমি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাংলাদেশের জন্য গুরুতর। জাতিসংঘের এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য ভূমি ও জীবিকা হারানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং এতে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই ঝুঁকির প্রভাব শুধু উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বাড়লে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমতে পারে, নিরাপদ পানির সংকট বাড়তে পারে এবং মৎস্যসম্পদের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। জীবিকার সন্ধানে মানুষ অন্য এলাকায় গেলে শহর ও গ্রাম উভয় জায়গায় জনসংখ্যা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। জলবায়ু পরিবর্তন তাই কৃষি ও পরিবেশের গণ্ডি পেরিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, নগরায়ণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি ধরে রাখা, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের মতো উদ্যোগের কথা সরকার জানিয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যানও বৃহত্তর পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি সবুজ শিল্প, পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি, সার্কুলার অর্থনীতি এবং জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
এসব উদ্যোগের অর্থ হলো— আন্তর্জাতিক সহায়তার দাবি বাংলাদেশের নিজস্ব দায়িত্ব পালনের বিকল্প নয়। বরং অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে উদ্যোগের সাফল্য শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। ২৫ কোটি গাছের মধ্যে কতটি টিকে থাকল, নদী খননে কত কিলোমিটার কাজ হলো— তার পাশাপাশি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কতটা ফিরল এবং স্থানীয় কৃষক ও জনগোষ্ঠী কতটা উপকৃত হলো, তাও মূল্যায়নের অংশ হতে হবে।
জলবায়ু পরিকল্পনায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি। কৃষি, পানি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প, নগরায়ণ, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে জলবায়ু পরিকল্পনার সমন্বয়ও প্রয়োজন। কারণ একটি ঘূর্ণিঝড় শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না; এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা এখানেই। বাংলাদেশ নিজের দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু একা বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি এড়ানো বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন। একই বাস্তবতা বিশ্বের অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এখানে ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ নীতির গুরুত্ব সামনে আসে। জলবায়ু পরিবর্তন সবার সমস্যা হলেও সবার দায় সমান নয়; আবার সবার সক্ষমতাও এক নয়।
ঐতিহাসিকভাবে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী এবং অধিক অর্থনৈতিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর ওপর নিঃসরণ কমানো ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহযোগিতা করার বড় দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের পাঁচ দফা প্রস্তাবে— নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন অর্থায়ন, প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। ফলে এসব দাবি শুধু বাংলাদেশের জন্য অর্থ বা প্রযুক্তি চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের দায়, সক্ষমতা ও ক্ষতির বৈষম্যকে বৈশ্বিক নীতির আলোচনায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরাও এর উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক জলবায়ু আলোচনাতেও ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর, সাশ্রয়ী অর্থায়ন, অভিযোজন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত একটি প্রজন্মগত প্রশ্ন। আজকের উন্নয়ন, জ্বালানি ব্যবহার, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশনীতি আগামী দিনের পৃথিবীকে নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশের বৈশ্বিক নিঃসরণে অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হলেও এর অভিঘাত বহন করতে হচ্ছে বড় পরিসরে। তাই জলবায়ু ন্যায্যতা বাংলাদেশের জন্য কোনো কূটনৈতিক স্লোগান নয়; এটি মানুষের জীবন, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সিনিয়র কৃষিবিদ ও প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে