অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গেলে কেবল গতানুগতিক ধারা বজায় রাখলেই চলে না, বরং সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিমালায় সাহসী ও দূরদর্শী সংস্কার আনতে হয়। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলার চড়াই-উতরাই আজ আমাদের সামনে এক বড় প্রশ্ন চিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পুরোনো ও ক্ষয়িষ্ণু কৌশলের ওপর নির্ভর করে বর্তমান শতকের জটিল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব।
দূর থেকে দেখলে একে একটি শান্ত নদী মনে হয়; মসৃণ স্রোত, ঝিকমিক করা জল। কিন্তু এর কাছে গেলেই চোখে পড়ে ক্ষয়িষ্ণু পাড়, জমে থাকা পলি আর জলের নিচে তৈরি হওয়া ভয়ংকর ঘূর্ণি। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে প্রকৃত অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আমাদের পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, পুরোনো এই প্রবৃদ্ধির মডেল দেশটিকে আর বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।
একসময় বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণই বাংলাদেশের অবকাঠামোগত অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। সেই ঋণের বদৌলতে দেশজুড়ে রাস্তাঘাট নির্মিত হয়েছিল, নতুন নতুন এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছেছিল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ঋণ গ্রহণ একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ না থেকে অভ্যাসে পরিণত হয়। প্রতিটি বাজেট ঘাটতি পূরণ করার সহজ সমাধান হিসেবে যখন আরেকটি নতুন ঋণ নেওয়া সংস্কৃতিতে রূপ নেয়, তখনই অর্থনীতির মূল ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়তে শুরু করে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগুলোই স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে ঋণের বোঝা কতটা ভারী ও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই সরকার ৩২৮,০০০ কোটি টাকারও বেশি (প্রায় ২ বিলিয়ন পাউন্ড বা ২.৭ বিলিয়ন ডলার) নতুন ঋণ গ্রহণ করেছে। এর ফলে দেশের মোট সরকারি বা পাবলিক ঋণ এখন ২.২৫ মিলিয়ন কোটি টাকার রেকর্ড মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল অঙ্কের দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় এক চরম শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
যেকোনো আর্থিক ঋণের সবচেয়ে নির্মম ও যন্ত্রণাদায়ক অংশ হলো তার ওপর আরোপিত উচ্চ সুদের পরিমাণ। শুধু গত এক বছরেই সরকারের কেবল ঋণ ও তার সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে ১৩৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ খরচ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেটের ব্যয়ের হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি পাঁচ টাকার মধ্যে অন্তত এক টাকাই চলে যাচ্ছে পুরোনো দেনা মেটাতে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে দেশের স্কুল, আধুনিক হাসপাতাল কিংবা দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষার মতো অত্যন্ত জনকল্যাণমূলক খাতে স্থায়ী বিনিয়োগ করা সম্ভব হতো।
সরকারের এই লাগামহীন ঋণ গ্রহণের সংস্কৃতি মূলত গতকালের অপরিকল্পিত ও খামখেয়ালি আর্থিক সিদ্ধান্তের আজকের এই চড়া মূল্য পরিশোধের রূপ। ভবিষ্যত প্রজন্মের ওপর ঋণের এই মরণফাঁদ তৈরি করে আমরা সাময়িক স্বস্তি হয়তো পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। উন্নয়নের নামে বিদেশ থেকে চড়া সুদে ঋণ এনে তা যদি উৎপাদনশীল খাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা না যায়, তবে তা দেশকে এক স্থায়ী দেউলিয়াত্বের কিনারে দাঁড় করিয়ে দেয়, যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ প্রান্তিক মানুষকে।
একটি দেশের সরকারের নিজস্ব আয় বাড়ানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো কর আহরণ বা ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘ বছর ধরে ৭ শতাংশের নিচেই আটকে রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়াসহ পুরো বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। রাষ্ট্র যখন তার নিজস্ব নাগরিকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়, তখন দেশ চালাতে গিয়ে বাধ্য হয়েই দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়, যা আমাদের পুরো অর্থনীতিকে একটি দুষ্টচক্রে আটকে ফেলে।
আমাদের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যপ্রণালিতে স্বচ্ছতা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়। বড় বড় করদাতা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নানা উপায়ে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেলেও সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ পরোক্ষ করের চাপে পিষ্ট হন। রাজস্ব সংগ্রহের এই বৈষম্যমূলক ও দুর্বল কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রের কোষাগার সবসময় শূন্য থাকে। ফলে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারকে বারবার বিদেশি দাতা সংস্থার কাছে হাত পাততে হয়।
গত কয়েক বছর ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার মূল কারণ হলো রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের তুলনায় আমদানিসহ অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি এবং আমদানির এলসি পরিশোধ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছে। ডলারের এই তীব্র সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার জন্য কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন খাত ও খুচরা বাজারে।
অস্থির অর্থনীতি, দফায় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকলে পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অথচ সে তুলনায় মানুষের প্রকৃত আয় বা মজুরি বাড়েনি। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধান নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক বড় হুমকি।
বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের সিংহভাগ বা প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে কেবল তৈরি পোশাক খাত থেকে। কয়েক দশক ধরে এই একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তন হলে বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে এই খাত হোঁচট খায়। তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল বা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো সম্ভাবনাময় অন্য খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতি সহায়তার বড়ই অভাব রয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে এবং সাধারণ গ্রাহকরা তাদের নিজেদের জমানো আমানত সময়মতো তুলতে পারছেন না। ব্যাংকিং খাতের এই আস্থার সংকট রোধ করতে না পারলে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সব পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার পরও দেশে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই আসেনি। এর পেছনে মূল কারণ হলো জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, দুর্নীতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন দেখেন একটি ব্যবসা শুরু করতে বা লাইসেন্স পেতে মাসের পর মাস ঘুরে মরতে হয়, তখন তারা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশে চলে যান। বিনিয়োগের এই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা অসম্ভব।
দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ সমাজ আজ চরম হতাশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও মেধার যথাযথ মূল্যায়নের অভাবের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মেধাবী তরুণ দেশ ছেড়ে উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমাচ্ছেন, যাকে আমরা ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচার বলে থাকি। অথচ এই যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত। বেকারত্বের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত প্রাণস্পন্দন হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত। কিন্তু ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ বা প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ছোট উদ্যোক্তারা সবসময় বৈষম্যের শিকার হন। বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো রাজনৈতিক প্রভাবে সহজে ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজির অভাবে মার খেয়ে যান। মুদ্রাস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ধাক্কা দিচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ। নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং প্রলয়ংকরী বন্যার কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কৃষিজমি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করার সময় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থনীতি বা গ্রিন গ্রোথ নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার না দিলে আমাদের সব প্রবৃদ্ধি এক নিমেষে ধুলায় মিশে যেতে পারে।
দেশের অর্থনীতিকে এই দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা ও ঋণের জাল থেকে মুক্ত করতে হলে সবার আগে আর্থিক খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অর্থ পাচার রোধ করা, কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং ব্যাংকিং খাতের লুটেরাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার মাধ্যমেই কেবল অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
কোনো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশের অর্থনৈতিক নীতি বা পলিসিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে, তবে বিদেশি বা দেশি বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জাতীয় অর্থনৈতিক রূপরেখা তৈরি করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমিকে আমাদের নতুন প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একক খাতের ওপর নির্ভরতা চিরতরে ঘুচে যায়।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা