টিকার পরও হামের প্রাদুর্ভাব : কিছু জরুরি প্রশ্ন

কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান

মতামত

হাম এতটাই সংক্রামক যে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় সামগ্রিক

2026-08-17T04:31:57+00:00
2026-08-17T04:59:52+00:00
 
  সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
২ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
মতামত
টিকার পরও হামের প্রাদুর্ভাব : কিছু জরুরি প্রশ্ন
কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩১ এএম  আপডেট: ১৭.০৮.২০২৬ ৪:৫৯ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
হাম এতটাই সংক্রামক যে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় সামগ্রিক টিকাদানের হার ৯০ শতাংশ হলেও তা হাম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ টিকাবঞ্চিত ১০ শতাংশ শিশু যদি একই মহল্লা, বস্তি, শরণার্থী শিবির কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকে, তা হলে সেখানে সংক্রমণের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পকেট তৈরি হতে পারে।

হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। এটি প্রতিরোধে কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি হামের সংক্রমণ আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 

গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে প্রায় দেড় লাখ সংক্রমণ এবং প্রায় ৯০০ শিশুর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ হাম প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর। একটি ডোজ টিকা প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং দুই ডোজ প্রায় ৯৭ শতাংশ কার্যকর। 

অর্থাৎ টিকা নেওয়ার পরও অল্পসংখ্যক ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন, কিন্তু টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। হামের এ প্রাদুর্ভাবে মূল সমস্যা টিকার কার্যকারিতায় নয়; বরং টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশু, অসম্পূর্ণ টিকাদান, জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি এবং ভাইরাসের অত্যন্ত দ্রুত বিস্তারের মধ্যে।

হাম এতটাই সংক্রামক যে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় সামগ্রিক টিকাদানের হার ৯০ শতাংশ হলেও তা হাম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ টিকাবঞ্চিত ১০ শতাংশ শিশু যদি একই মহল্লা, বস্তি, শরণার্থী শিবির কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকে, তা হলে সেখানে সংক্রমণের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পকেট তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রান্তদের বড় অংশ টিকা নেয়নি অথবা টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেনি। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সন্দেহভাজন মৃত্যুর বড় অংশ দুই বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন- এক ডোজ টিকা এবং দুই ডোজ টিকা এক বিষয় নয়। 

প্রথম ডোজের পর কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি নাও হতে পারে। দ্বিতীয় ডোজের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রথম ডোজে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই ‘টিকা দেওয়া হয়েছে’ বলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; নির্ধারিত দুই ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক ব্যাঘাতের প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুরা পরবর্তী সময়ে হামের জন্য একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ সম্পর্কে উল্লেখিত ২০২৬ সালের ডঐঙ সমীক্ষায় ২০২৪-২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

হামের বিস্তারের ক্ষেত্রে পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। বদ্ধ পরিবেশে ভাইরাস কিছু সময় সংক্রমণক্ষম থাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি, শরণার্থী শিবির, স্কুল, হাসপাতাল কিংবা পরিবারের মধ্যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকেই দ্রুত বহু মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন। তাই হামের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ কভারেজ যথেষ্ট নয়; ৯৫ শতাংশের বেশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

তবে দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কেউ কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ কোনো টিকাই শতভাগ কার্যকর নয়। দুই ডোজ হামের টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৯৭ শতাংশ হওয়ায় অল্পসংখ্যক টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

বিশেষ করে ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের সময় টিকাপ্রাপ্ত শিশুরাও ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু এটি টিকার ব্যর্থতা নয়; বরং টিকা যে সংক্রমণ ও গুরুতর রোগের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে কমায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। হামের বিস্তারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপুষ্টি। অপুষ্ট শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। 

ফলে টিকা নেওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। একই সঙ্গে অপুষ্ট শিশুর হামের জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি হামের জটিলতা বাড়াতে পারে। হামের সঙ্গে অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সহসংক্রমণ হলে রোগের তীব্রতাও বেড়ে যেতে পারে।

অ্যাডিনোভাইরাসসহ অন্যান্য জীবাণুর সহসংক্রমণ হামের রোগীদের জটিলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
হামের আরেকটি উদ্বেগজনক প্রভাব হলো ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ বা রোগপ্রতিরোধ স্মৃতির দুর্বলতা। হামের ভাইরাস শরীরের কিছু মেমোরি কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা আগে পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। 

ফলে হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও কিছু সময় শিশুর অন্যান্য সংক্রমণের প্রতি ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। অতএব, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য শিক্ষা। টিকার প্রাপ্যতা, সময়মতো প্রয়োগ, দুই ডোজ সম্পন্ন করা এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চমাত্রার টিকা কভারেজ নিশ্চিত করা- সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি শিশুকে টিকা দেওয়া মানে শুধু সেই শিশুকে সুরক্ষিত করা নয়; তার পরিবার, সহপাঠী এবং পুরো সমাজকে সুরক্ষিত করা।

বিপরীতে, কিছু শিশু যদি টিকার বাইরে থেকে যায় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর জমতে থাকে, তাহলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান হামের অভিজ্ঞতা তাই আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছে-  প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে, প্রতিটি শিশুর দুই ডোজ নিশ্চিত করতে হবে এবং জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশের বেশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে হবে। তাহলেই হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস বিআরবি হাসপাতাল
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   টিকা  হাম  প্রাদুর্ভাব  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: