শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন চলছে অনৈতিক প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি জিপিএ-৫ দেখাতে পারবে, কার বিজ্ঞাপন কত বেশি চকচকে হবে- এই নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা কোনো মানুষ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রচারের এক একটি সস্তা ‘প্রোডাক্ট’ বা পণ্য। এই ইঁদুরদৌড়ে জয়ী হতে গিয়ে কিছু নামি স্কুল-কলেজ নীতিবোধকেও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করছে না।
প্রকাশিত হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। দেশজুড়ে যখন জিপিএ-৫ পাওয়ার জোয়ার ভাসছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে দীর্ঘদিন থেকে লুকিয়ে থাকা একটি নির্মম সত্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কদর্য রূপটিকে উন্মোচন করে দিয়েছে। তথাকথিত ‘শতভাগ এ প্লাস’ পাওয়ার গৌরব ধরে রাখার অন্ধ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে দেশের নামিদামি বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার এই বাণিজ্যিক মোহে নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায় সব বিষয়ে পাস করা সত্ত্বেও অসংখ্য শিক্ষার্থীকে মূল বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
শিক্ষা আজ আলোর মশাল হওয়ার কথা থাকলেও কিছু প্রতিষ্ঠানের দেয়ালের ভেতরে তা রূপ নিয়েছে এক অন্ধকার কারাগারে। যে শিশুটি সব বিষয়ে পাস করে বোর্ড পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, কেবল ‘এ প্লাস’ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই বলে তার স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থপরতার এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক বর্জনের প্রথম আঘাতটি আসে কিশোর মনের মনস্তাত্ত্বিক দেয়ালে, যা মুহূর্তেই এক ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। সমবয়সিরা যখন নতুন বই আর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মগ্ন, তখন একদল শিক্ষার্থীকে ঘরের কোণে বসে কাঁদতে হয় অপরাধীর মতো। পরীক্ষার আগেই তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে দেওয়ার এই মানসিক ট্রমা একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর পুরো চিন্তাজগৎকে ওলটপালট করে দেয়।
কৈশোরের রঙিন দিনগুলোতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর চোখে থাকে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন আর বুকভরা প্রত্যাশা। কিন্তু এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে চোখের পলকে ঘটে যায় এক নির্মম স্বপ্নভঙ্গ, যা তাদের ভবিষ্যতের আশাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। যে কিশোরটি হয়তো বোর্ড পরীক্ষায় নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে চমকপ্রদ কিছু করতে পারত, তাকে লড়ার সুযোগটুকুই দেওয়া হলো না। স্বপ্নের এই অকালমৃত্যু কেবল একটি পরীক্ষার সুযোগ কেড়ে নেয়নি, বরং একটি সম্ভাবনাময় জীবনের ডানা শুরুতেই ছেঁটে দিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক এই বৈষম্যের শিকার তরুণদের মধ্যে নিঃশব্দে জেঁকে বসছে এক গভীর বিষণ্নতা। তারা নিজেদের সমাজের বোঝা এবং পরিবারের জন্য লজ্জার কারণ মনে করতে শুরু করেছে। একসময় যে প্রাণোচ্ছল মুখগুলো ক্লাসরুম মাতিয়ে রাখত, আজ তারা একাকিত্বের চাদরে মুখ লুকিয়ে সমাজের এই নির্মম বিচারহীনতাকে প্রশ্ন করে চলেছে।
এই তীব্র মানসিক চাপ ও হতাশা অনেক শিক্ষার্থীকে ঠেলে দিচ্ছে মাদক, ইভটিজিং ও বাল্যবিয়ে প্রবণতার দিকে। যখন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বাঁচাতে একজন শিক্ষার্থীর সচল থাকার ইচ্ছাকেই কেড়ে নেয়, তখন তা বড় অপরাধ নয় কী। ‘এ প্লাস’ এর চেয়ে যে একটি জীবন অনেক বড়, এই সাধারণ সত্যটি আজ আমাদের শিক্ষালয়গুলো ভুলে গেছে।
যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের তুলে দেন, সেখানে এখন তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। শিক্ষকরা যেখানে হবেন পথপ্রদর্শক, সেখানে তারা আজ আবির্ভূূত হয়েছেন কঠোর করপোরেট ম্যানেজারের ভূমিকায়। বাণিজ্যিক আচরণের ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যকার পবিত্র সম্পর্কের অবসান ঘটছে।
এ ঘটনার পেছনে জড়িয়ে আছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের বিশাল আর্থিক ক্ষতি, যা অনেক পরিবারকে দেউলিয়া করে দেয়। বছরের পর বছর ধরে স্কুলের বেতন, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং আর বইখাতার পেছনে হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগের শেষ পরিণতি যখন হয় এমন বর্জন, তখন তা সহ্য করা কঠিন। একটি বছর নষ্ট হওয়া মানে পরিবারের ওপর আরও এক বছরের বাড়তি খরচের বোঝা চেপে বসা, যা অনেক দরিদ্র অভিভাবকের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজও এই বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহজে মেনে নেয় না, ফলে তারা ভোগে এক গভীর সামাজিক হীনম্মন্যতায়। আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের তির্যক চশমা আর বাঁকা কথা তাদের প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে। সমবয়সিদের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর সাহসটুকু তারা হারিয়ে ফেলে। এই হীনম্মন্যতা তাদের সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তারা নিজেদের এক প্রকার অস্পৃশ্য ও ব্যর্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
অন্যদিকে সন্তানের এই পরিস্থিতিতে সমাজের মুখোমুখি হতে গিয়ে অভিভাবকরা এক চরম অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন। তারা ভাবতে শুরু করেন, হয়তো সন্তানকে ভালো কোনো কোচিংয়ে দিতে পারেননি বা যাতায়াতের সঠিক সুবিধা দিতে পারেননি বলেই আজ এই দশা। নিজের বুকভাঙা কষ্ট চেপে রেখে সমাজের বাঁকা কথার তীরে বিদ্ধ হতে হতে অনেক বাবা-মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন চলছে অনৈতিক প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি জিপিএ-৫ দেখাতে পারবে, কার বিজ্ঞাপন কত বেশি চকচকে হবে- এই নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা কোনো মানুষ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রচারের এক একটি সস্তা ‘প্রোডাক্ট’ বা পণ্য।
এই ইঁদুরদৌড়ে জয়ী হতে গিয়ে কিছু নামি স্কুল-কলেজ নীতিবোধকেও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করছে না। শিক্ষার এই চরম বাণিজ্যিকীকরণ আজ আমাদের সমাজকে এক অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা এখন আর সেবা নয়, এটি হয়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার এক বিশাল ও লাভজনক ব্যবসা।
যেখানে শিক্ষার্থীর মেধা বা নৈতিকতার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং ভর্তি বাণিজ্যের আসন সংখ্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বাণিজ্যিক রূপ শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
এই ব্যবস্থার কারণে যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সততা ও ন্যায়ের পাঠ দেবেন, তারাই আজ জিপিএ-৫ এর ভুয়া পরিসংখ্যান তৈরি করতে জালিয়াতি আর বর্জনের আশ্রয় নিচ্ছেন। শিক্ষকরাই যদি এমন অনৈতিক পথ বেছে নেন, তবে সেই শিক্ষা খোদ শিক্ষার্থীদের কী মূল্যবোধ শেখাবে?
এই বৈষম্যমূলক নীতি সমাজে ধনী-দরিদ্রের এবং সুযোগের এক বিশাল বৈষম্য বৃদ্ধি করছে। বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা হয়তো বিভিন্ন উপায়ে অন্য কোনো পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু সাধারণ পরিবারের সন্তানরা এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে হারিয়ে যায়। শিক্ষা যেখানে সামাজিক সমতা আনার হাতিয়ার, সেখানে আজ তা নিজেই কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরির প্রধান কারখানায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো- এই প্রকাশ্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকা বা ন্যায়বিচারহীনতা। নির্বাচনি পরীক্ষায় পাস করার পরও কেন একজন শিক্ষার্থীকে মূল পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হবে না, এই প্রশ্নের কোনো যৌক্তিক উত্তর বোর্ডের নীতিমালায় নেই। অথচ বুক ফুলিয়ে এই অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী প্রতিষ্ঠানগুলো।
সব মিলিয়ে এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত রূপ। একটি সমাজ কতটা ভেতর থেকে পচে গেছে, তা বোঝা যায় যখন তার শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের লালন করার বদলে তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে শুরু করে। মেধার এই বলির পাঁঠা বানানোর উৎসব যদি এখনই বন্ধ করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমরা এমন এক সমাজ পাব যেখানে কোনো সহানুভূতি, প্রেম বা মানবিকতার অস্তিত্ব থাকবে না।
এই দমবন্ধকর যোগ্যতার অবমূল্যায়নও মেধা পাচার বা ব্রেন ড্রেনের একটি কারণ। দেশের তরুণ ও প্রতিভাবান মেধার দল যখন দেখে যে এখানে যোগ্যতা বা মেধার চেয়ে যান্ত্রিক সংখ্যা আর অনৈতিক প্রতিযোগিতার মূল্য বেশি, তখন তারা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশের সেরা মস্তিষ্কগুলো যদি এভাবেই অন্যায়ের শিকার হয়ে বাইরে চলে যায়, তবে এই দেশ কখনোই আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে না।
এই নীরব কর্ম আমাদের উপহার দিচ্ছে এক বিবেকহীন সমাজ। নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থীর বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অধিকার আইনগতভাবে নিশ্চিত করতে হবে এবং তথাকথিত ‘শতভাগ এ প্লাস’-এর ভুয়া গৌরব বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাকে ব্যবসার খাতা থেকে বের করে এনে আবার মানুষের অধিকারের জায়গায় ফিরিয়ে আনাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে