প্রাণীদের কল্যাণে সবার উচিত যার যার অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। আইন প্রণেতাদের উচিত প্রাণীদের সুরক্ষায় আরও কঠোর ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করা। যারা প্রাণীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। সরকারিভাবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকে এই বিষয়ে আরও তৎপর ও আন্তরিক হতে হবে অবিলম্বে। আইনের সঠিক প্রয়োগই পারে অবলা প্রাণীদের জীবন বাঁচাতে।
বিশ্ব প্রাণী কল্যাণ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রাণীদের অধিকার ও ভালোবাসার কথা। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির বাঁচার অধিকার রয়েছে। আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে পৃথিবীটা শুধু আমাদের একার নয়।
প্রতি বছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী কল্যাণ দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো : ‘তাদের চোখে বিশ্বকে দেখুন’। এটি মানুষকে মানবকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে প্রাণীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও দুর্ভোগ বোঝার এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষায় সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানায়। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হলো প্রাণীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের নিষ্ঠুরতা থেকে প্রাণীদের রক্ষা করতে এই দিনটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।
পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণী একে অপরের পরিপূরক। কোনো একটি বিশেষ প্রজাতি হারিয়ে গেলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। মৌমাছি না থাকলে পরাগায়ন বন্ধ হয়ে মানুষের খাদ্য সংকট দেখা দেবে। প্রকৃতিতে কেউ এককভাবে বেঁচে থাকতে পারে না, সবাই সবার ওপর নির্ভরশীল।
জলজ এবং স্থলজ সব প্রাণীর অবদান এই প্রকৃতির বুকে অপরিসীম। বনের বাঘ কিংবা সমুদ্রের নীল তিমি সবাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামুদ্রিক প্রাণীরা বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণে সাহায্য করে। কীটপতঙ্গ মাটির উর্বরতা বাড়িয়ে আমাদের কৃষিকাজকে অনেক সহজ ও সফল করে। প্রতিটি ক্ষুদ্র জীবও প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
বন্যপ্রাণী বনের পরিবেশ রক্ষা করে আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচায়। সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণ না থাকলে বন উজাড় হয়ে যেত। বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ বন বেশি মাত্রায় কার্বন শোষণ করে। প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব একটি সুনির্দিষ্ট ও সুন্দর দায়িত্ব রয়েছে। তারা মানুষের কোনো ক্ষতি না করে নীরবে পৃথিবীর সেবা করে যাচ্ছে।
গৃহপালিত প্রাণী প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়েছে। গরু, ঘোড়া কিংবা কুকুর আমাদের নানাভাবে প্রতিনিয়ত সাহায্য করে আসছে। পোষা প্রাণী মানুষের মানসিক চাপ কমাতে দারুণ কাজ করে। তারা শুধু আমাদের সম্পদ নয় বরং বিশ্বস্ত ও পরম বন্ধুও বটে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষা না হলে মানুষের অস্তিত্ব চরম সংকটের মুখে পড়বে। আজ অনেক প্রাণী বিলুপ্তির পথে, যা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে প্রতিদিন বহু প্রজাতি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে মানুষ একদিন প্রকৃতির রোষানলে পড়ে ধ্বংস হবে। আমাদের স্বার্থেই সব প্রাণীর কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিধান করা আবশ্যক। তাই সব প্রাণীকে রক্ষা করা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই প্রয়োজন।
পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করতে প্রাণীদের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি জীব বাস্তুতন্ত্রের এক একটি অতি প্রয়োজনীয় ও সক্রিয় উপাদান। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে অন্য প্রজাতির ওপর প্রভাব পড়ে। ডারউইনের বিবর্তনবাদও প্রকৃতির এই আন্তঃসম্পর্কের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। বাস্তুতন্ত্রের জটিল জালকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকা দরকার। উপাত্ত অনুযায়ী বনের শিকারি প্রাণী তৃণভোজীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি নেকড়ে বা বাঘ না থাকে, তবে হরিণের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে যাবে।
কীটপতঙ্গ ও পাখির অবদান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তারা উদ্ভিদের পরাগায়ন ঘটিয়ে পৃথিবীর ফলমূল ও ফসলের উৎপাদন সচল রাখে। যদি এই ক্ষুদ্র প্রাণী না থাকে, তবে কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় দেখা গেছে, পাখির মল মাটির পুষ্টিগুণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞান তাই বলে, ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র প্রাণীর কল্যাণও মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বন্যপ্রাণীদের ভূমিকা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত ও স্বীকৃত। হাতি এবং গন্ডার বনের বড় গাছপালা ছাঁটাই করে আলো চলাচলে সাহায্য করে। এর ফলে বনের নিচের ছোট গাছগুলো দ্রুত বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
বিজ্ঞানীদের মতে এই প্রক্রিয়া বনের কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতা অনেক বাড়ায়। পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থে এবং ধর্মীয় যাজকগণ প্রাণীদের সেবা করার নির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মে প্রাণীদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, প্রাণীরাও মানুষের মতো এক একটি সম্প্রদায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রাণীদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পুণ্যের কথা বলেছেন। কোনো প্রাণীকে খাঁচায় আটকে রেখে কষ্ট দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সনাতন ধর্মে প্রতিটি জীবের মধ্যে ঈশ্বরের অংশ বিরাজমান বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রায় সব দেব-দেবীর বাহন হিসেবে কোনো না কোনো পশু বা পাখি রয়েছে। যেমন দুর্গার বাহন সিংহ এবং কার্তিকের বাহন হলো ময়ূর। গো-মাতাকে সনাতন ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র ও পূজনীয় মনে করা হয়। অহিংসা পরম ধর্ম— এই বাণী সব প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার কথাই বলে।
সনাতন ধর্মগ্রন্থগুলো তাই প্রাণীদের রক্ষা করাকে পরম পুণ্য হিসেবে গণ্য করে। খ্রিস্টধর্মেও ঈশ্বরের সব সৃষ্টির প্রতি যত্নবান হওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বাইবেলে বলা আছে, ধার্মিক ব্যক্তি তার পশুর প্রাণের প্রতি সদয় থাকে। সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসি প্রাণীদের পরম বন্ধু এবং রক্ষক হিসেবে পরিচিত। তিনি পাখিদের উদ্দেশেও ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন বলে জানা যায়।
বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি হলো সব জীবের প্রতি অহিংসা ও মৈত্রী ভাব। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, কোনো প্রাণীকে হত্যা বা আঘাত করা যাবে না। জীব হত্যা মহাপাপ— এই বাণী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পালন করে থাকেন। সব প্রাণীর সুখ ও শান্তি কামনা করা এই ধর্মের লক্ষ্য।
অন্যান্য আদিবাসী ও প্রাচীন ধর্মেও প্রকৃতির উপাদান ও প্রাণীদের পূজা করা হতো। তারা বিশ্বাস করত, পশুপাখি প্রকৃতির দূত এবং তাদের ক্ষতি করা অমঙ্গলজনক। আমেরিকান আদিবাসীরা শিকার করার পর সেই প্রাণীর আত্মার কাছে ক্ষমা চাইত।
জগদ্বিখ্যাত মনীষীগণ সবসময়ই প্রাণীদের অধিকার ও কল্যাণের পক্ষে কথা বলেছেন। কবি ও সাহিত্যিকগণও প্রাণীদের নিয়ে চমৎকার সব উক্তি ও কবিতা লিখেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্র জীবের প্রতি গভীর অনুরাগ দেখিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলামও খাঁচার পাখিকে মুক্ত করার আকুল আবেদন জানিয়েছেন কবিতায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় রূপসী বাংলার পশুপাখি জীবন্ত রূপ ধারণ করেছে বারবার। সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার গল্পে কুকুরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়েছেন।
প্রাণীদের কল্যাণে সবার উচিত যার যার অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। আইন প্রণেতাদের উচিত প্রাণীদের সুরক্ষায় আরও কঠোর ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করা। যারা প্রাণীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। সরকারিভাবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকে এই বিষয়ে আরও তৎপর ও আন্তরিক হতে হবে অবিলম্বে। আইনের সঠিক প্রয়োগই পারে অবলা প্রাণীদের জীবন বাঁচাতে।
সাধারণ জনগণের ভূমিকা প্রাণীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। আমাদের নিজেদের বাড়ির আশপাশে থাকা কুকুর-বিড়ালের প্রতি সদয় হওয়া উচিত। ক্ষুধার্ত প্রাণীকে একটু খাবার ও জল দিলে তাদের জীবন বাঁচে সহজে। কোনো প্রাণীকে বিনা কারণে আঘাত করা বা উত্ত্যক্ত করা মোটেও উচিত নয়। পাড়ার সবাই মিলে রাস্তার প্রাণীদের দেখভাল করলে সমাজটা সুন্দর হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো কোমলমতি শিশুদের মনে প্রাণীপ্রীতি গড়ে তোলা।
পাঠ্যপুস্তকে প্রাণীদের গুরুত্ব এবং তাদের প্রতি দয়ার গল্প অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের প্রাণীদের ভালোবাসতে শেখান তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মানবিক হবে। উপাত্ত দেখায়, ছোটবেলায় যারা পশুপ্রেমী হয়, তারা বড় হয়ে ভালো মানুষ হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে স্কুল-কলেজে নিয়মিত সেমিনার ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা দরকার।
গণমাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে প্রাণীদের অধিকার ও কল্যাণ প্রচারের ক্ষেত্রে। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার। প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীদের জীবনের নান্দনিক রূপ ও গুরুত্ব তুলে ধরা যায়। রেডিও ও ইন্টারনেটে প্রাণী কল্যাণের বার্তা প্রচার করলে তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে দারুণ সাহায্য করতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে