যুদ্ধবিরতিতে কেমন আছে গণহত্যার শিকার গাজাবাসী

সাব্বির রহমান

মতামত

কল্পনা করুন : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক দম্পতি তাদের অনাগত সন্তানকে ঘিরে হাজারটা রঙিন স্বপ্ন বুনছে। আর মাত্র কয়েকটা দিন,

2026-10-03T04:56:26+00:00
2026-10-03T04:56:26+00:00
 
  শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
যুদ্ধবিরতিতে কেমন আছে গণহত্যার শিকার গাজাবাসী
সাব্বির রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
কল্পনা করুন : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক দম্পতি তাদের অনাগত সন্তানকে ঘিরে হাজারটা রঙিন স্বপ্ন বুনছে। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই তাদের ঘরে আসবে এক ফুটফুটে শিশু। তাকে ঘিরে কত শত পরিকল্পনা, কত প্রস্তুতি, কত না দেখা স্বপ্নের আঁকিবুঁকি! কিন্তু সেই সুন্দর আলো ফোটার সকালটি আর কখনো এলো না।একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে চোখের পলকে ছিন্নভিন্ন করে দিল তাদের সব আয়োজন। 

শরীর থেকে অঝোর ধারায় রক্ত ঝরতে ঝরতে, অসহনীয় যন্ত্রণা বুকে চেপে মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। যে অনাগত প্রাণকে নয়টি মাস নিজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগলে রেখেছিলেন, সেই রক্তমাংসের পিণ্ডটিও আর পৃথিবীর আলো দেখল না। আর বাবা? একটিমাত্র মুহূর্তেই হারিয়ে ফেললেন তার অর্ধাঙ্গিনী, কলিজার টুকরো সন্তান আর তিল তিল করে গড়ে তোলা রাজ্য। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে যেন চিৎকার করে বলছেন, ‘খোদা, আমাকেই বা বাঁচিয়ে রাখলে কেন? আর কী পরীক্ষা নেওয়া বাকি ছিল আমার এই তুচ্ছ জীবনের?’

কী ভয়াবহ, তাই না? যে পরিবারটি কয়েক দিন পরেই নতুন একটি জীবনকে সুস্বাগতম জানানোর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিল, নিমিষেই সেই ঠিকানা রূপ নিল এক নিথর মহাশ্মশানে।

না, এটা কোনো বানানো গল্প নয়। কিংবা কোনো পর্দায় ভেসে ওঠা সিনেমার দৃশ্যও নয়। এটা আজকের ধরণির সবচেয়ে নির্মম ও কঠিন বাস্তবতা। ফিলিস্তিনের মাত্র ১৯ বছর বয়সি অন্তঃসত্ত্বা মা আমাল আল-আজলার সঙ্গে ঘটে যাওয়া রক্তভেজা বাস্তবতার এক ছিটেফোঁটা মাত্র। 

এমন অসংখ্য নারকীয় কাহিনির নিত্যসাক্ষী হচ্ছেন গাজার শত শত মা, শত শত বাবা। আর তথাকথিত সভ্য বিশ্ব সেই পৈশাচিকতাকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুয়েকটি ‘স্যাড রিয়েক্ট’ আর মেকি সমবেদনায় বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নীরবে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারী ও বড় বড় হরফে যখন ‘যুদ্ধবিরতি’র মিথ্যা আশ্বাস ঝোলে, বিশ্ববাসী হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এক নিঃশব্দ হাই তোলে আর ভাবে, যাক এবার তবে সুরাহা হলো। অথচ গাজার ইট-পাথরের ধূসর ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা নিরন্ন মানুষগুলো খুব ভালো করেই জানে : এটি আদতে যুদ্ধ থামানোর কোনো ইতিবাচক চুক্তি নয়; এটি কেবল তাদের রক্তের ওপর চলতে থাকা দীর্ঘ গণহত্যাকে আড়াল করার এক আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট।

ক্যাপশন আর কাগজের চুক্তিতে বলা হয় সংঘাত নাকি সাময়িক স্থবির অথচ গাজার আকাশে মৃত্যুর রক্তচক্ষু এক মুহূর্তের জন্যও আড়াল হয় না। বিকট যুদ্ধবিমানের গর্জনের বদলে সেখানে এখন নিঃশব্দে ভেসে বেড়ায় ইসরাইলি নজরদারি ড্রোনের যান্ত্রিক গুঞ্জন, যা কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই মুহূর্তেই নির্ভুল টার্গেটে রূপ নেয়। 

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাব এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, রক্তক্ষয়ী এই আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে ৭৪ হাজার থেকে ৭৫ হাজারের ঘর। আর যদি নিখোঁজ হয়ে ধূলিসাৎ হওয়া দালানের নিচে চিরতরে চাপাপড়া আনুমানিক ১০ হাজারের বেশি মানুষকে হিসাবের খাতায় আনা হয় তবে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার ছুঁইছুঁই! তথাকথিত এই ভঙ্গুর ‘যুদ্ধবিরতির’ নামকাওয়াস্তে আবহেও প্রতিদিন গড়ে ছাই বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন কোনো না কোনো বসতভিটা, কেড়ে নেওয়া হচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো : গাজায় ঝরে যাওয়া প্রতি তিনটি মরদেহের দুটিই কোনো সশস্ত্র যোদ্ধা নয়; তারা নিতান্তই নিষ্পাপ শিশু আর অবলা নারী! প্রাপ্ত তথ্যমতে এ পর্যন্ত অন্তত ২১ হাজার থেকে ২২ হাজারেরও বেশি শিশুর প্রাণবায়ু নিভে গেছে গাজায়। আর নিহত নারীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১৮ হাজারের কোঠা। অর্থাৎ গাজার এই মৃত্যুর মিছিলে প্রায় ৫৪ থেকে ৬০ শতাংশই কেবল নারী ও শিশু! 

আধুনিক মানব ইতিহাসের যেকোনো যুদ্ধে বেসামরিক সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মা ও শিশুদের এত বিপুল হারে সুনির্দিষ্টভাবে নিধন করার নজির আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে শিশুরা কালকেও ধূলিধূসরিত পথে কাগজের নৌকা ভাসানোর স্বপ্ন বুনত, তারা আজ ছেঁড়া পলিথিনের নিচে নিজের রক্তমাখা হাতে খুঁজে ফিরছে মা-বাবার বিচ্ছিন্ন হাত-পা। আর যে মায়েরা সন্তানদের বুকের ওমে জড়িয়ে শান্তিতে ঘুমাতেন, তারা আজ এক ফোঁটা মাতৃদুগ্ধের অভাবে নিজের কোলেই নিষ্পাপ সন্তানকে খিদেয় ধুঁকে ধুঁকে, তিলে তিলে মারা যেতে দেখছেন।

গাজার আসল সত্যকে পৃথিবীর দরবারে তুলে ধরার যে কটা অবরুদ্ধ চোখ জেগে ছিল, তাদেরও একে একে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি যেন তথ্যের ওপর এবং সত্য প্রকাশ করার ওপর চালিত এক নজিরবিহীন আঘাত। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে। গায়ে স্পষ্ট ‘প্রেস’ লেখা জ্যাকেট পরা সত্ত্বেও, মাথায় হেলমেট আর হাতে ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও তরুণ সাংবাদিকদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হয়নি। 

বিশ্বের কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে সংবাদকর্মী নিহতের এই হার এত নির্মম কখনো ছিল না। আল জাজিরা থেকে শুরু করে স্থানীয় যেসব তরুণ সংবাদকর্মী গাজার ফুটপাথে রক্তে ভেসে যাওয়া শিশুদের ছবি ক্যামেরাবন্দি করছিলেন, দূরনিয়ন্ত্রিত মিসাইল এসে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তাদের কার্যালয়, শেষ সম্বল ঘরবাড়ি আর স্বজনদের কোল। উদ্দেশ্য বড্ড পরিষ্কার : ভেতরের এই জীবন্ত নরককুণ্ডের আসল চিত্র যেন কোনোভাবেই পৃথিবীর মুক্ত মানুষের দ্বারে পৌঁছাতে না পারে।

আর এই রক্তগঙ্গা যখন অবলীলায় বইছিল, তখন জাতিসংঘ বা বিশ্বের বড় পরাশক্তিগুলো কী করছিল তা বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। তারা কেবল নীরব দর্শকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঝলমলে ঘরে বসে বিশ্বনেতারা একের পর এক ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন, টেবিলে হাজারটা প্রস্তাব পাস করেছেন। 

কিন্তু তাদের সেই ঠান্ডাঘরের ফাঁকা বুলি গাজার কোনো নিষ্পাপ শিশুর দিকে ধেয়ে আসা একটি বোমাকেও এক সেকেন্ডের জন্য আটকাতে পারেনি। পারেনি একটা মায়ের জীবন বাঁচাতে। মুখে তারা মানবাধিকারের বড় ভাষণ ঠিকই দিয়েছে, কিন্তু পেছনের দরজা দিয়ে ইসরাইলের হাতে তুলে দিয়েছে হাজার কোটি টাকার মারণাস্ত্র আর কূটনৈতিক সুরক্ষাকবচ। নিজেদের ভেটো ক্ষমতাকে ঢাল বানিয়ে থামিয়ে দিয়েছে বিচার চাওয়ার সব আইনি পথ। তাদের এই নিস্পৃহ নীরবতা কি সরাসরি এই স্বজন হারানোর অপরাধে অংশ নেওয়ার সমান নয়?

আজ গাজার হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালে বুকটা হঠাৎই কেঁপে ওঠে। এগুলো আর কোনো নিরাময় কেন্দ্র নেই, রক্ত আর পচা মাংসের গন্ধে দম আটকে আসা একেকটি কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। একটু অবশ করার ওষুধ নেই, নেই এক টুকরো ব্যান্ডেজ কিংবা জীবনের শেষ ভরসা অ্যান্টিবায়োটিক। সীমান্তের ওপারে থরে থরে আটকে রাখা হয়েছে খাবারের ট্রাক। 

একটু অবশ না করেই ছোট ছোট শিশুদের হাত-পা কেটে ফেলতে হচ্ছে, আর তাদের যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতালের বাতাস। ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর চারপাশের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের ফাঁদে ফেলে পুরো একটা জাতিকে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ যেন যুদ্ধের নামে একটি পুরো জাতিকে ধরণির বুক থেকে মুছে ফেলার ঠান্ডা মাথার চক্রান্ত।

গাজাবাসীর ঝরে যাওয়া রক্তে আজ শুধু তাদের মাতৃভূমির মাটি ভিজছে না, ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে আমাদের কথিত সুশীল সমাজের মূল্যবোধ আর বিবেকের শেষ চিহ্নটুকুও। ইতিহাস কিন্তু কাউকে মাফ করবে না। 

খুব স্পষ্ট করে লেখা থাকছে : যখন একটা আস্ত শহরকে কবরস্থান বানানো হচ্ছিল, যখন অবুঝ শিশুদের আকুল কান্না আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, তখন পৃথিবীর মোড়লরা কেবল চোখ বুঁজে হাত গুটিয়ে বসে ছিল। গাজা আজ আস্ত পৃথিবীর বুকের ওপর জেগে থাকা এক রক্তাক্ত ক্ষত, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের এই সুবিধাবাদী বিশ্ববিবেককে ধিক্কার দিয়ে যাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   যুদ্ধবিরতি  গণহত্যা  গাজাবাসী 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: