ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮৩৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। বিপুল এই অর্থ বরাদ্দের পরও রাজধানীর অনেক সড়ক, অলিগলি, খোলা জায়গা ও ড্রেনের পাশে বর্জ্যরে স্তূপ দেখা যায়। বিশেষ করে বড় সড়কের সংযোগস্থলে এমনভাবে ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং করে রাখা হয়, যার ফলে পথচারীদের নাকে রুমাল দিয়ে রাস্তা পারাপার হতে হয়। নির্ধারিত সময়ে অনেক এলাকায় বর্জ্য অপসারণ হয় না।
যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে যে, এত টাকা খরচ করার পরও ঢাকার পরিচ্ছন্নতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না কেন?
সময়ের আলোয় গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন ও জনবল প্রয়োজন।
বর্জ্য কোথা থেকে, কখন সংগ্রহ করা হবে এবং সংগৃহীত বর্জ্য কোথায় যাবে সেটি একটি কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। রাজধানীর অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি মূলত করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সংগঠন। এসব প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মূল ব্যবস্থার সমন্বয়ে ঘাটতি রয়েছে।
বর্জ্য পৃথকীকরণ ও এর পুনর্ব্যবহারেও দুর্বলতা রয়েছে। রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ ও অন্যান্য বর্জ্য একসঙ্গে ফেলা হলে এর বড় অংশই পুনর্ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস তৈরি করা সম্ভব। প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপকরণও পুনর্ব্যবহার করা যায়।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইলে বর্জ্য থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্পের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই বর্জ্যকে শুধু অপসারণের বস্তু হিসেবে দেখলে চলবে না। একে সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য বরাদ্দের টাকা কীভাবে খরচ করা হচ্ছে সেটি একটা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মজুরি, পরিবহনের জ্বালানি ও নিয়মিত পরিচালন ব্যয়েই যদি বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা খরচ হয় তা হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ ব্যাহত হতে পারে। সিটি করপোরেশনের কোন ওয়ার্ডে কত বর্জ্য সংগ্রহ হয়েছে, কতটি গাড়ি চলেছে, কতবার বর্জ্য পরিবহন করা হয়েছে— এসব তথ্য নিয়মিত যাচাই করা দরকার। ঠিকাদারি কাজের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কাজ না করে বা নিম্নমানের কাজ করে বিল নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। মাঠপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা দরকার।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়। নগরবাসীকে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায় থেকে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জ্ঞান নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আইন আছে। তবে আইনের প্রয়োগ দুর্বল হলে সুফল মিলবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের বিকল্প নেই।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার জন্য এটা অপরিহার্য। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য সরকার প্রতি বছর বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। এতে সরকারের সদিচ্ছাই প্রকাশ পায়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিপুল বরাদ্দের সুফল রাজধানীবাসী ভোগ করছে কি না। শুধু নতুন প্রকল্প নিলেই হবে না, চলমান ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সমাধান করাও জরুরি।
উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বর্জ্য সংগ্রহ করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা। বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে জোর দিতে হবে। সবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে