চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন নয়জন। আরও সাতজন আহত হয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, জাহাজের আবদ্ধ চেম্বার গ্যাসমুক্ত না করেই শ্রমিকদের কাজ করানো হচ্ছিল। দুর্ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
গতকাল সময়ের আলোতে ‘বিষাক্ত গ্যাসে ৯ মৃত্যু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এলএনজি ট্যাঙ্কের চারপাশ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে কয়েকজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে ভেতরে পড়ে যান। ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান কার্গো বা ইঞ্জিন রুম গ্যাসমুক্ত করা হলেও ছোট আবদ্ধ চেম্বারগুলোতে বিষাক্ত গ্যাস জমে ছিল।
শিল্প সচিবও পরে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন। যথাযথ গ্যাস পরীক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই শ্রমিকদের সেখানে কাজ করতে পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। দুর্ঘটনার পরও ইয়ার্ডে অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন ও প্রশিক্ষিত জরুরি উদ্ধার দলের দেখা মিলল না কেন সেই প্রশ্ন উঠেছে।
জাহাজভাঙার কাজে ঝুঁকি আগে থেকেই চিহ্নিত করা সম্ভব। এটি শিল্পসংশ্লিষ্টদের অজানা নয় যে, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন মনোক্সাইড, অ্যামোনিয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস আবদ্ধ স্থানে জমে থাকতে পারে। কোনো ট্যাঙ্ক বা চেম্বারে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস পরীক্ষা ও বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা মৌলিক শর্ত। অথচ গ্যাসমুক্ত না করেই কাজ শুরু করা হয়েছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যোগ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা না থাকা, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি এবং প্রশিক্ষণের অভাব।
শিল্প সচিব বলেছেন, দুর্ঘটনাটি যে ইয়ার্ডে ঘটেছে, সেটি কমপ্লায়েন্স ইয়ার্ড এবং তার নিরাপত্তা অডিটও হয়েছে। এই বক্তব্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, অডিট বা একটি সনদ কি নিরাপদ কর্মপরিবেশের স্থায়ী নিশ্চয়তা দিতে পারে? সনদ দেওয়ার পর নজরদারি দুর্বল থাকলে সেটি কাগুজে কমপ্লায়েন্সে পরিণত হয়। প্রতিদিনের কাজের সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যাপ্ত জনবল ও নজরদারি ছাড়া কাজ চললে সেটি কমপ্লায়েন্সের প্রকৃত উদ্দেশ্যকেই দুর্বল করে। আর দুর্ঘটনার পর প্রায় দুই ঘণ্টা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিল না কেন সেটা জানা দরকার।
জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১৬১ জন মারা গেছেন। অভিযোগ আছে, শ্রমিকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ নেই। তাদের ওপর দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ থাকে। যোগ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। প্রশিক্ষণের ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে। সীতাকুণ্ডে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ বিষাক্ত গ্যাস হলেও এর গভীরে রয়েছে উৎপাদন বাড়ানো ও খরচ কমানোর সঙ্গে শ্রমিকের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব না দেওয়ার সংস্কৃতি।
এই সংস্কৃতি বদলানো না গেলে শুধু তদন্ত কমিটি করে বা দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড, বিস্ফোরক অধিদফতর, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে প্রতিটি ইয়ার্ডের ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
সীতাকুণ্ডের ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা আশা করব, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত হবে। তদন্তে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে, দায় নির্ধারণ করা হবে বলে আমরা আশা করতে চাই। দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের সুপারিশও হয়তো থাকবে। তবে সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে কি না, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।
সময়ের আলো/এসএকে