‘গণমাধ্যম তবু ব্যবসায়, তব ব্যবসায়’- বিশ্বব্যাপী অনেকাংশেই যে রোল মডেল বিরাজমান তার মনস্তত্ত্ব ফলো করেন মতিউর রহমানও। মধ্যবিত্ত। এই এক বিত্ত যেখানে সকলে এসে এক হন, যে যার জায়গা থেকে। কল্পনার দুনিয়া সাজানোর বাসনায়। তাই মধ্যবিত্তের বাজারে ভিড় বেশি। আর গণমাধ্যম ভিড়ই চায়। এমনকি নীরবতারও ভিড়। যেমন কোনো বড় মৃত্যুর শোকাচ্ছন্ন দিন। আট কলাম ছবি। ভিজ্যুয়াল বৃহৎ অ্যাঙ্গেল। সেদিন শোকে শোকে বাড়তি বিজ্ঞাপন। গণমাধ্যম বেঁচে থাকে গণচর্চাতেই। সেই চর্চা ধরে যে যার চর্যাটি সিদ্ধ করেন।
মতিউর রহমান : কী করেন। তার খায়েশগুলা কোন কোন পথ অতিক্রম করতেছে
বাংলা ভাষার সর্বাধুনিক দৈনিকটি প্রথম আলো। তার সম্পাদক মতিউর রহমান। যত নিন্দিত, নন্দিত আরও বেশি। সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক সৃজনশীলতা, মুনশিয়ানা আর সদা সঞ্চরণের আকুলতায় অদ্বিতীয়। তিনি একজন লেখক। চিন্তার দুনিয়ায় বিজ্ঞ পরিব্রাজক। চিন্তা করেন আর কল্পনা থেকে নামিয়ে সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেন। যেন কোনো জাদুকর। ইশারা করছেন আর পাতাজুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বর্ণ। সেই সব অক্ষরে মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতি, আশা-হতাশা, সময়-অসময়, রাগ-অনুরাগ।
হাজার বছর পর যদি কোনো বাংলা ভাষার কবি ধুলা ঝাড়ে আর্কাইভে; খুঁজে পায় প্রথম আলো প্রিন্টার্স লাইনে লেখা নাম- যেন কতদিন আগের এক কারওয়ান বাজার; সেইখানে বসে দেশ-বিদেশে অক্ষরের জাদু দেখাইতে দোকান দিছিলেন সুন্দর মুখের এক লোক। নম্র তবে নীরব ক্ষেপাটে। কোনো পাইকারি-খুচরা নয়, জাতীয়-বেসরকারি দাপুটে মহাজন- মতিউর রহমান।
মধ্যবিত্তের না পারা কল্পনাকেই কাজে লাগান কি?
‘গণমাধ্যম তবু ব্যবসায়, তব ব্যবসায়’- বিশ্বব্যাপী অনেকাংশেই যে রোল মডেল বিরাজমান তার মনস্তত্ত্ব ফলো করেন মতিউর রহমানও। মধ্যবিত্ত। এই এক বিত্ত যেখানে সকলে এসে এক হন, যে যার জায়গা থেকে। কল্পনার দুনিয়া সাজানোর বাসনায়। তাই মধ্যবিত্তের বাজারে ভিড় বেশি। আর গণমাধ্যম ভিড়ই চায়। এমনকি নীরবতারও ভিড়। যেমন কোনো বড় মৃত্যুর শোকাচ্ছন্ন দিন। আট কলাম ছবি। ভিজ্যুয়াল বৃহৎ অ্যাঙ্গেল। সেদিন শোকে শোকে বাড়তি বিজ্ঞাপন।
গণমাধ্যম বেঁচে থাকে গণচর্চাতেই। সেই চর্চা ধরে যে যার চর্যাটি সিদ্ধ করেন।
মতিউর রহমান কী করেন। তার খায়েশগুলা কোন কোন পথ অতিক্রম করতেছে
প্রথম আলো প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে চলতি বুদ্ধিজীবিতার সম্মিলন ঘটান। রাষ্ট্রপরিচালকদের প্রভাবিত করতে কালচারাল বেল্ট তৈরি করেন এবং সেইটার বাণিজ্যিকীকরণে টায়ে টায়ে আগায় যান। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে আছে, যদি নামকরা কেউ মারা যান, আর প্রথম আলোর প্রকাশনী ‘প্রথমা’ থেকে তার কোনো বই প্রকাশ হয়ে থাকে, মতিউর রহমান তার স্মরণে কিছু লিখে থাকেন। সেই স্মরণের ফাঁকে ফাঁকে প্রথমা থেকে বের হওয়া মৃত লোকটির বইয়ের পরিচিতি তুইলা ধরেন। এইভাবে ছোট থিকা বড়, সড়ক থেকে কানাগলি সব জায়গায় তিনি গণমাধ্যমের চর্চাটি চান আপন চর্যাসিদ্ধির মধ্য দিয়া। তার অনেক সাহস, সেই সাহসে ভর কইরা তিনি অনেক কিছু করছেন, শুধু নিজেরেই জয় করতে পারেন নাই।
নিজেরে কি জয় করা যায়?
বিশ্বখ্যাত নারী সুফি কবি রাবেয়া বসরী (আনুমানিক ৭১৬-৮০১ খ্রিস্টাব্দ) একবার বিকালে সাগরপাড়ে হাঁটতেছিলেন। তখন এক লোক সালাম দিয়া নিজের পকেটে হাত দেন আর একটা দিনার হাতের তালুতে নিয়া আগায় আসেন। বলেন, মা হুজুর, আমি এই দিনারটা হাদিয়া দিতে চাই, আমি গরিব, যদি গ্রহণ করতেন। রাবেয়া বসরী আগায় আসেন, লোকটার হাতের তালু থিকা পয়সাটা তুইলা নেন। এরপর নিজের জামার ভাঁজ থিকা আরেকটা দেরহাম বের করেন এবং সোনা-রুপার মুদ্রা দুইটারে এক কইরা সাগরে ছুইড়া মারেন। লোকটা তখন প্রশ্ন করে- এর অর্থ কী? রাবেয়া বলেন, কোনো কিছুরে জোড়া বানায়ো না। শেষে নিজের কাছেই ফিরতে হয়।
মাহফুজ আনাম কিং নয়, কিং মেকার : বাধার মুখে সাংবাদিকতার দীর্ঘ লড়াই
আবুল মনসুর আহমেদ (১৮৯৮-১৯৭৯) একাধারে শক্তিমান লেখক, চিন্তক ও রাজনীতিবিদ। তিনি নিজের সৃজনশীল রচনা, কর্ম ও চিন্তার পাশাপাশি রেখে গেছেন নিজের ঐরসজাত এমন উত্তরসূরি, বাংলাদেশের আকাশে যিনি উজ্জ্বল এক তারকা রচনা করেছেন- দ্য ডেইলি স্টার। এই তারায় সবার মুখ দেখান না সম্পাদক মাহফুজ আনাম। উচ্চ বর্ণের এই সম্পাদক বিশ্বকে বাংলাদেশ দেখান বটে, কিন্তু সেই দেখানোটা প্রায়শই ঘুরে আসে নিজেরই বৃত্তে। তবু এই বঙ্গে এই ফুল না ফুটলে গর্ব করতে পারতাম না। তিনি আমাদের শুধু দারুণ আইটেমই দেন না, পত্রিকার পাতার সুন্দর ম্যাকআপ-ট্রিটমেন্টও সবার তুলনায় ভালো শিখাইছেন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক হিসেবে যেই জুলুমের শিকার হয়েছেন মাহফুজ আনাম, তার যৎসামান্যও অন্য অনেক বড়, মাঝারি ও নিম্নমানের সম্পাদকরা ফেস করেননি।
একটি বিশ্বস্ত ও এলিট সূত্র সম্প্রতি আমারে জানায়, মাহফুজ আনাম যখন ডেইলি স্টারে যুক্ত হতে দেশে ফিরবেন, তার আগে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিতজনদের বলেছিলেন- আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি কিং হতে নয়, কিং মেকার হতে। আওয়ামী মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতার পুত্র হিসেবে বাবার সেই পলিটিক্যাল জার্নি আরেক মোড়কে জারি রেখেছেন তিনি। এই জন্যই মেবি হাসিনা আমলে এত জুলুম নাইমা আসে তার ওপর। এইটা হজম করা কতই না কষ্টের যখন বেনজীরের মতোন একটা নিচুস্তরের ‘রাষ্ট্রীয় কীট’ তাকে হুমকি দেয়। তারপর মামলার ওপর মামলা।
মাহফুজ আনাম ব্যক্তিত্বে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, যুক্তিবাদী এবং স্পষ্টভাষী। রাজনীতির প্রচলিত হিসাব-নিকাশের সঙ্গে তার বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার একটা টানাপোড়েন আছে মনে হয়। ফলে তিনি যেমন সম্মান পেয়েছেন, তেমনি বিরোধিতারও মুখোমুখি হয়েছেন।
একজন সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনামের পথ খুব মসৃণ না। রাষ্ট্রীয় চাপ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, হুমকি এবং ক্ষমতাবানদের অসন্তোষ- বিভিন্ন সময়ে এসবের মুখোমুখি হয়েও তিনি সাংবাদিকতার জায়গা থেকে অনেকাংশে সরে যাননি। তার সম্পাদিত ‘দ্য ডেইলি স্টার’ও দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষ করে জরুরি অবস্থা ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংবাদমাধ্যমের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, সেই সময় ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে বহুবার। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অস্বস্তির কারণ হতে পারেÑ এমন সংবাদ প্রকাশের ঝুঁকি তখন ছিল বাস্তব। সেই পরিবেশে সংবাদপত্র চালানো কেবল পেশাগত দায়িত্বের বিষয় ছিল না; ছিল ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিও।
পরবর্তী সময়েও মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে একটি পুরোনো প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্কের পর তার বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দায়ের করা হলে বিষয়টি শুধু একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই হিসেবে থাকেনি; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছিল।
তবে মাহফুজ আনামের সাংবাদিকতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে তার নিজের ভুল ও বিতর্কগুলোকেও বাদ দেওয়া যায় না। সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো তথ্য যাচাই এবং ভুল হলে তার দায় স্বীকার করা। তিনি অতীতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের সিদ্ধান্তকে নিজের বড় ভুল হিসেবে স্বীকার করেছেন। এই আত্মসমালোচনাও তার সাংবাদিকসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
একজন সম্পাদককে শুধু তার ভুল দিয়ে বিচার করলে তার দীর্ঘ পথের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। মাহফুজ আনামের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো- চাপের মধ্যেও সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ধরে রাখার চেষ্টা। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার কারণে যে মূল্য দিতে হয়, সেই মূল্য দেওয়ার মানসিকতা একজন সম্পাদককে তার পেশার সীমানা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ভূমিকার মধ্যে নিয়ে যায়।
মাহফুজ আনামের দীর্ঘ সাংবাদিকতা তাই নিখুঁত কোনো গল্প নয়। এটি সাফল্য, ভুল, আত্মসমালোচনা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের গল্প। সমালোচকেরা তার সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন; কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় চাপের মধ্যেও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকার যে অধ্যায়, সেখানে ‘মাহফুজ আনাম’ নামটি অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হবে।
লেখক : কবি ও চিন্তক