বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে আমরা ভয়াবহ অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করেছি। কোনো কোনো বিশেষ সংস্থার দাপুটে প্রভাব-প্রতিপত্তি, অন্যায় হস্তক্ষেপ এবং অযাচিত নজরদারির মতো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে অনেক। ফলত, সাংবাদিকরা অনেকাংশে সেলফ সেন্সরশিপের কলঙ্কের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আবার এটাও ঠিক সাংবাদিকতা পেশার মোটামুটি উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী হয়েছে। তারাও অবলীলায় বিসর্জন দিয়েছেন এই পেশার মহত্ত্ব, গুরুত্ব এবং সম্মানকে। আত্মবিক্রয়ের সেই ঘটনা এ পেশার মহত্ত্ব ও মর্যাদাকে কালিমালিপ্ত করেছে।
অন্য সব পেশার চেয়ে সাংবাদিকতা অবশ্যই ভিন্ন ধরনের। এতে রয়েছে বহুমাত্রিক ঝুঁকি, প্রাণহানির ঘটনাও নিতান্ত কম নয়। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সারা দেশে মোট ৬৯ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। দুই হাজার চব্বিশের সর্বপ্লাবী ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত যে অধ্যায়, সেখানেও ছয়জন সাংবাদিকের রক্ত মিশে আছে। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই সময়ে সাংবাদিকতা পেশার ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ কোনো অংশই কমেনি, বরং বেড়েছে। মিডিয়ার যে মূলধারা, সেটি জনআস্থা হারিয়েছে বেশ আগেই, তা ফেরত পাওয়া দূর অস্ত। মোবাইল সাংবাদিক ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে সনাতনী সাংবাদিকতা মুখোমুখি হয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জের। সেগুলোর প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ অনুসন্ধানের একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক সমীক্ষা করা প্রয়োজন। তার নিরিখেই সম্মিলিতভাবে সংকট নিরসনের উপায় বের করতে হবে। নিতে হবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ।
সমাজমাধ্যমের (সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যাপক ও যথেচ্ছ ব্যবহার সুস্থ সাংবাদিকতার অন্তরায় ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। একটা কথা আছে- ‘ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়’। মোবাইল সাংবাদিকতার নামে অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ভাইরাল হয়। ভোক্তা শ্রেণি যাচাই-বাছাই না করেই এসব তথ্য (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপতথ্য, গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রটনা) বিশ্বাস করে ফেলে। বলা যায়, বিশ্বাস করার জন্য বোধহয় মুখিয়েই থাকে।
রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনাবলিই শুধু নয়, মোবাইল সাংবাদিকতার আনাড়িপনা ও দায়িত্বহীনতার শিকার হচ্ছেন ব্যক্তি মানুষও। অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার পাশাপাশি প্রতিহিংসা-জিঘাংসা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই গণমাধ্যমকে। ১৮ কোটি জনঅধ্যুষিত বাংলাদেশে সেল ফোনের নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি। বিস্ময়কর এই তথ্য গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ঠাঁই করে নেওয়ার যোগ্য। নিন্দুকেরা ঠাট্টা করে বলতে পারেন এটা অবশ্যই গৌরবময় (!) একটি অর্জন। আমরা যে কূপমণ্ডূক রয়ে গেছি, এটা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
বর্তমান সময়ে হাতে হাতে মোবাইল সেট। তথ্যের জন্য আর অপেক্ষা করতে হয় না। বোতাম টিপলেই এন্তার তথ্য। দেশ-বিদেশের। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার, সংবাদ সংস্থার অনলাইন নিউজপোর্টাল, মাল্টি মিডিয়ায় ভূরি ভূরি তথ্য। পাঁচমিশালি, বারোয়ারি তথ্যের এতই বিপুল সম্ভার যে ভোক্তার দিশাহারা হয়ে পড়ার মতো অবস্থা। গুজব কিংবা খারাপ কথা দ্রুত ছড়ায় এটা তো আমরা সবাই জানি। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো জো নেই।
কী কী ক্ষতি হয় এর ফলে? কোনো ব্যক্তি মানুষের চরিত্র হনন, কুৎসা রটনা, তার ভাবমূর্তির বারোটা বাজানো, তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা তো আছেই; গোপন অডিও-ভিডিও ফাঁস, সেসব ভাইরাল হওয়ার ঘটনা তো আকছারই ঘটছে। আরও মারাত্মক বিপদের ঝুঁকিও রয়েছে। অশান্তি, অস্থিরতা, অরাজকতা সৃষ্টির ইন্ধন থাকে এসব প্রচারণায়। একবার আপলোড হলেই হলো, রকেটগতিতে তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। ক্ষতি যা হওয়ার, অতিদ্রুত সংঘটিত হয় সেই অপরাধ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক ভারসাম্য-স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমনকি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও হুমকির সম্মুখীন হয়। এই যে সাইবার অপরাধ- সেটা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে আইন আছে, প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃপক্ষও আছে। কিন্তু কার্যকর অগ্রগতি ও সাফল্য এখনও তেমন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না।
কী তা হলে সমাধান? সমস্যাটি অতীব জটিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাদামাঠা বা সোজাসাপটা কোনো উপায় আছে নিরসনের, এ কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবা অবান্তর। মাথা ব্যথা হলে ওষুধ প্রয়োজন। মাথা কেটে ফেলার কথা চিন্তা করা নির্বুদ্ধিতার নামান্তর। এমন কোনো পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে, যাতে ‘সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে’। নিয়ন্ত্রণ তো করতেই হবে কোনো না কোনোভাবে। তবে সেটা হতে হবে গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ, সহনীয়। ভোক্তাশ্রেণিকে এই মর্মে অবগত ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে যে এই স্বেচ্ছাচারের বিষফল ও পরিণতি কতটা ভয়ংকর। বিশ্বের কিছু কিছু দেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে। এমন দেশের সংখ্যা ক্রমেই কিন্তু বাড়ছে, ধীরগতিতে হলেও। আমাদের চিন্তাভাবনা করা ও পদক্ষেপ নেওয়ার সময় সমাগত।
এ বিষয়ে অংশীজনের সম্পৃক্ততায় কোনো টাস্কফোর্স বা কমিশন গঠনের কথা চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। তারা একটি নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমের মধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব-গভীরতা-ব্যাপকতা সমীক্ষা, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশমালা প্রণয়ন করবেন। সরকারকে কঠোরভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে সেসব বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে বিপদ বাড়বে আরও বেশি মাত্রায়। সরকারই শুধু না, ব্যক্তি মানুষও বিপদাপন্ন হবেন। সুতরাং আর কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে আমরা এ প্রস্তাবনার সাহসী, সময়োচিত বাস্তবায়ন দেখতে আগ্রহী।
অনলাইন নিউজপোর্টাল, মাল্টিমিডিয়া মুহূর্তের মধ্যে হালনাগাদ (আপডেট) তথ্য আমাদের দিচ্ছে। কে কার আগে তথ্য দিতে পারবে, তা নিয়ে আমরা তাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতার মনোভাব লক্ষ করি। তথ্যপ্রবাহের তাৎক্ষণিক সঞ্চালনের এই যে প্রক্রিয়া, ওতে বিপদ, ঝুঁকি, ভোক্তার আস্থা হারানোর আশঙ্কা- কোনোটাই কম নেই। অতিদ্রুত তথ্য পরিবেশনার কাজটি করতে গিয়ে সংকট-সমস্যার গভীরে যাওয়া যায় না। কম সময়ে সেটা সম্ভবপরও নয় অবশ্য। চটজলদি ‘লাইভ’ করতে গিয়ে বা সংবাদ পরিবেশনার সময় খণ্ডিত তথ্য উপস্থাপিত হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। আবার এমনটাও ঘটে যে, লঙ্ঘিত হয় সাংবাদিকতার অন্যতম মৌল নীতি। অভিযুক্তের ভাষ্য ছাড়া তথ্য প্রচার, পরিবেশনা বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষুণ্ন করে। পাঠক-শ্রোতা দর্শক পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে তো পারেনই না, উল্টো বিভ্রান্ত হতে হয় তাদের।
এই ড্যামেজকে রিপেয়ার করা হবে কী করে? সংশোধনী দিলে কী পূর্ণাঙ্গ প্রায়শ্চিত্ত হয়, না হতে পারে? তথ্যপ্রবাহ হচ্ছে নদীর স্রোতের মতো। দুবার এক জলে ডুব দেওয়া যায় না। সে জন্য সংবাদ পরিবেশনকারী রিপোর্টার/ফটোগ্রাফারকে অতিসাবধানে পা ফেলতে হয়। থাকতে হয় সদা সতর্ক। তাৎক্ষণিক তথ্য পরিবেশনার গুরুদায়িত্বকে তুলনা করা যায় দুধারী তলোয়ারের সঙ্গে। আসতে কাটে, যেতেও কাটে। সুতরাং কী করণীয়? মোটা দাগে বলা যায়, করণীয় হলো পর্যাপ্ত চেক, ক্রসচেকের মাধ্যমে তথ্য বা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ একটি অবয়ব ভোক্তা সমীপে উপস্থাপন। তার জন্য খানিকটা বিলম্ব হওয়া স্বাভাবিক। এই চাহিদা, নীতিনিষ্ঠতা ও বাস্তবতা জেনে এবং মেনেই কাজ করতে হবে সাংবাদিকদের।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের ঝুটঝামেলা, হুমকি, প্রলোভন, লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হতে হয় সাংবাদিকদের। এটা জেনেই তাদের এই পেশায় আগমন এবং দায়িত্ব পালনের প্রচেষ্টা। রকমারি প্রেশার গ্রুপ আছে। তারা থাকবেই। যতই না গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করুক, এসব প্রেশার গ্রুপের প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ প্রভাব প্রতিপত্তি থাকবেই। চোখ রাঙানি, শাসানির যে দুর্বৃত্তপনা, তা মোকাবিলা করেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হবে সাংবাদিকদের। প্রেশার গ্রুপের মূলোৎপাটন কিছুতেই করা সম্ভব নয়।
বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে আমরা ভয়াবহ অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করেছি। কোনো কোনো বিশেষ সংস্থার দাপুটে প্রভাব-প্রতিপত্তি, অন্যায় হস্তক্ষেপ এবং অযাচিত নজরদারির মতো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে অনেক। ফলত, সাংবাদিকরা অনেকাংশে সেলফ সেন্সরশিপের কলঙ্কের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আবার এটাও ঠিক সাংবাদিকতা পেশার মোটামুটি উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী হয়েছে। তারাও অবলীলায় বিসর্জন দিয়েছেন এই পেশার মহত্ত্ব, গুরুত্ব এবং সম্মানকে। আত্মবিক্রয়ের সেই ঘটনা এ পেশার মহত্ত্ব ও মর্যাদাকে কালিমালিপ্ত করেছে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছেন আঁস্তাকুড়ে। তা নিয়ে আফসোস করার কিছু নেই। আমরা চাই সৎ, স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক সাংবাদিকতা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে তারুণ্যদীপ্ত স্বাপ্নিক নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে জনআস্থার একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিরবচ্ছিন্ন ও নিরঙ্কুশ করার যে চ্যালেঞ্জ, সেটা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা ব্যাপক। ইতিবাচক, মানবিক ও কল্যাণমুখী হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত গণমাধ্যম- এটা সবারই প্রত্যাশা। ইতিমধ্যেই সরকারপ্রধান সাংবাদিক সমাজকে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকার মিডিয়াকে হোস্টাইল করতে চান না।
এই অঙ্গীকার ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাই। বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পাঁচ মাসে গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কোনো চিন্তা-পদক্ষেপ বা উদ্যোগের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়নি। সেটা অবশ্যই স্বস্তিদায়ক ঘটনা। মিডিয়ার সামগ্রিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সেসব সংকট নিরসনের পথ বের করার লক্ষ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় স্বাধীন একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আলোচনা, মতবিনিময়, ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এ ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। গণমাধ্যমের সব স্তরের নেতাকর্মী, তথ্য ভোক্তা শ্রেণি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ জনআকাক্সিক্ষত একটি মিডিয়া জগৎ আমরা পাব। সত্যে তথ্যে বিশ্বাসে দেশপ্রেমে অঙ্গীকারে আমরা উজ্জ্বলতর হয়ে উঠব।
লেখক : কবি, সভাপতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব
সময়ের আলো/আআ