অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমি গণমাধ্যম কমিশনে একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। কেন এই কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল? তার আগে বলতে হয়, কেন গণমাধ্যম বলা হচ্ছে। আগে মিডিয়ার এতটা প্রসার হয়নি। প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়া রেডিও-টেলিভিশন ছিল। এখন এর ব্যাপ্তি বেড়েছে। অনলাইন থেকে শুরু করে ডিজিটাল, মাল্টিমিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া। এখন সব মিলিয়ে কিন্তু গণমাধ্যম হয়েছে। আর তাই গণমাধ্যম কমিশন হয়েছে।
স্বাধীনতার আগে শুধু প্রিন্ট মিডিয়া ছিল। আর বেতার ও টেলিভিশন ছিল। তাও আবার রাষ্ট্রীয় পরিচালনায়। স্বাধীনতার পর এলো আরও প্রিন্ট মিডিয়া। স্বাধীনতার পর মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ছিল গণতন্ত্র বহাল থাকবে। কিন্তু এ দেশের মানুষ যেভাবে প্রত্যাশা করেছিল সেভাবে গণতন্ত্র পায়নি। আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কতটুকু ছিল তা সবার কম-বেশি জানা। বিশেষ করে সংবাদপত্রের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন।
এ কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যেভাবে পাওয়া দরকার ছিল তা কিন্তু পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর জাতীয় সংসদ চলাকালে দেশের মানুষ আশা করেছিল বাকস্বাধীনতা থাকবে। কিন্তু বাকশাল গঠনের পর দেশে হাতে গোনা সংবাদপত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর সেনাশাসনকালে পত্রিকার স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়ে যায়।
নব্বইয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে সংবাদপত্রের বিকাশ শুরু হলেও সেই অর্থে স্বাধীনভাবে প্রকাশ হতে পারেনি। যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা মনে করেন, সংবাদপত্র তাদের পক্ষে থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের মানসিকতার বিষয়টি সম্পৃক্ত হয়ে যায়। একসময় পত্রিকার কোনো কোনো সাংবাদিক দলবাজ হয়ে যায়। এই পক্ষ হওয়ার ফলে সংবাদপত্র মনে করে, তারা শুধু সরকারের কথা বলবে। গণমাধ্যম যে গণমানুষের কথা বলবে তা অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে যায়। তবে দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে গণতন্ত্র সুসংহত হয়, সে কথা অনেকেই ভুলে যান। একইভাবে গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।
বিগত ১৭ বছরে দেশে সবচেয়ে বেশি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদপত্র শিল্পকে অনেক ক্ষেত্রে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যেসব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে তার গুণগত মানের চেয়ে সরকারের গুণগানের প্রাধান্য ছিল বেশি। সংবাদপত্র অবশ্যই সরকারের উন্নয়নমূলক তথ্য তুলে ধরবে। পাশাপাশি সরকারের ভুল ভ্রান্তিগুলো তুলে ধরা সংবাদপত্রের নৈতিক দায়িত্ব। এমন অনেক পত্রিকা রয়েছে যেখানে সার্কুলেশন সংখ্যা নিরূপণ করা দুষ্কর। অথচ তারা নিয়মিত পত্রিকা বের করে যাচ্ছে।
আমি গণমাধ্যমে একজন সদস্য হিসেবে কাজ করার সুবাদে যেসব তথ্য পাই, তা সত্যি অবাক করার মতো। ঢাকা শহরে ২৫০টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। কিন্তু এমন ৫০টি পত্রিকা রয়েছে যেগুলোর একটি সংখ্যাও হকার সমিতির কাছে পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা নিরূপণ ও তার সমাধানের জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হয়। কামাল আহমেদের নেতৃত্বে কমিশন বেশ সময় ধরে কাজ করে। কমিশন উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দসহ নানা মহলের সঙ্গে কথা বলে। এরই ভিত্তিতে বেশ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। যা পরবর্তী সময়ে কমিশনের রিপোর্ট লেখার ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক হয়।
গণমাধ্যম কমিশন উপলব্ধি করে বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্পের কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু শৈথিল্য রয়েছে। যে কারণে সংবাদপত্র স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। গণমাধ্যম কমিশন আরও উপলব্ধি করেছে, পেশাগতভাবে সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের যে আগে মর্যাদা ছিল তা এখন অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে। যে কারণে গণমাধ্যম কমিশন সংবাদপত্রের শিল্পের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আর পেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করে।
তবে সব সুপারিশ যে স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়ন হবে তাও নয়। কিন্তু যেসব সুপারিশ অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য তা নিরূপণ করা হয় কমিশনের রিপোর্টে। বিশেষ করে গণমাধ্যম কমিশন যখন তাদের রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে, তখন তিনি নিজেই বলেন, স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো দেওয়ার জন্য। কমিশন যথারীতি তা পেশ করে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আজ পর্যন্ত কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।
বর্তমান বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রীকে গণমাধ্যম কমিশনের রিপোর্ট দেওয়া হয়। তিনিও এ ব্যাপারে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন । কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দের এক সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। প্রধানমন্ত্রী খোলামেলা আলোচনায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ব্যাপারে সহমত পোষণ করেন। আমরা আশা করছি, এ সরকার নিশ্চয়ই গণমাধ্যম কমিশনের সুপারিশগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেবে।
আমাদের অন্যতম সুপারিশের মধ্যে ছিল- যিনি পত্রিকা প্রকাশ করছেন তার অবশ্যই অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকতে হবে। আর সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলা পত্রিকার সঙ্গে ইংরেজি পত্রিকাগুলোকেও বিবেচনা করতে হবে। শুধু তাই নয়, বাংলার সঙ্গে ইংরেজি পত্রিকার সিরিয়ালের ক্ষেত্রে যেন ন্যায়বিচার করা হয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের মধ্যে ছিল, সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য একটি আইন তৈরি করা এবং সাংবাদিকদের বেতনের ক্ষেত্রে প্রবেশকালীন ন্যূনতম বেতন ধার্য করা।
গণমাধ্যমের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্র শিল্প হিসেবে টিকে থাকা। কারণ এই প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া সামনে চলে এসেছে। অবশ্য যুগের চাহিদা অনুযায়ী এসব মিডিয়া উপেক্ষা করার কোনো অবকাশ নেই। তবে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যে সংবাদপত্র টিকে থাকবে সেই প্রত্যাশা করি। শুধু প্রত্যাশা করলে তো চলবে না।
টিকে থাকার জন্য পাঠকদের জন্য চাহিদা তৈরি করতে হবে। কারণ সংবাদপত্র পাঠকদের কাছে এখনও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এমন সংবাদ পরিবেশন করতে হবে যেন গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য তা সহায়ক হয়। এতে করে সংবাদপত্র স্বাধীনতাও ভোগ করতে পারবে। তবে স্বাধীনতার নামে যেন স্বেচ্ছাচারিতা না চলে, সেদিকেও দৃষ্টি সজাগ রাখতে হবে।
লেখক : সম্পাদক, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও