এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ১৯ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। এ বছর পাসের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে। জিপিএ-৫ও কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন।
পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের অভিনন্দন জানাই। তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি বা কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের হতাশ না হয়ে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্ব এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফল প্রকাশের পর রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া ও শেরপুরে কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। এটা দুঃখজনক। পরীক্ষার ফলকে জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি বানানো সংগত নয়। শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে, কারণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসন বলছে, অতীতে কৃত্রিমভাবে পাস ও জিপিএ-৫-এর হার বেশি দেখানো হতো।
তাদের দাবি, এবার উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কেউ কেউ পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের টানাপোড়েন ও পড়াশোনায় অনীহার মতো কারণের কথা বলছেন। শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার করা সংগত কি না সেই প্রশ্ন রয়েছে।
এ বছর ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। একই শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস আর কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল করার কারণ কী সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের দক্ষতায় ব্যবধান অনেক সময় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার গুণগত মানে পার্থক্য গড়ে দেয়।
গণিত ও ইংরেজির ফল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৬ থেকে ৮১ শতাংশ আর গণিতে প্রায় ৬৯ থেকে ৮৩ শতাংশের মধ্যে। গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞানে ঘাটতির অভিযোগ নতুন নয়। শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা কেন দূর করা যাচ্ছে না, সমস্যা কোথায়?
এবার আরেকটি প্রবণতা দেখা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগের অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। বিজ্ঞান বিভাগে ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ পাস করেছে। এতদিন বিজ্ঞান বিভাগে দুর্বলতার অভিযোগ শোনা যেত। মানবিকে এবার ফল বিপর্যয়ের কারণ কী? শিক্ষার দুর্বলতা যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হলে সামগ্রিক প্রক্রিয়ার নির্মোহ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ভালো না খারাপ সেই বিতর্কে আটকে থাকলে চলবে না। প্রতিটি শিক্ষার্থীর যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। তবে এই মূল্যায়ন যেন শুধু মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই করার প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার কারণও খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। শহর-গ্রামভেদে সব অঞ্চলে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষালাভের অভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মেধার পূর্ণ বিকাশে শিক্ষায় সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটানোর বিকল্প নেই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি