বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও হতে হবে বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী। কোনো সাময়িক আবেগ বা উত্তেজনার কারণে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। অর্থনীতির শক্তি বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগও বাড়ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখাই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু এটি নয় যে, কোনো নতুন সামরিক জোটে যোগ দেব কি না। মূল প্রশ্ন হলো, এ ধরনের অংশীদারিত্ব দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও কৌশলগত সুযোগ তৈরি করবে কি না। দেশের অর্থনীতি ও কূটনীতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি বহুপক্ষীয় পদক্ষেপ খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধপরবর্তী সময়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর প্রভাব ছিল বেশি। এখন বিশ্ব ক্রমেই বহুকেন্দ্রিক ও জটিল হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি কৌশলগত স্বাধীনতা চাইছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও নতুনভাবে হিসাব কষছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির মূল লক্ষ্য তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণে চুক্তিটিতে যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি রয়েছে, যা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহযোগিতা রয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তানবুলে চুক্তির আওতায় গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিন দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন। পরে চুক্তির আওতায় একটি সাধারণ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক ও ভূ-কৌশলগত সক্ষমতা— এই তিন দেশের সমন্বয় আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে চুক্তির পক্ষগুলো বলেছে, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক জোট নয় এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের বিকল্পও নয়। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ আছে, তেমনি রয়েছে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত— সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কোনো জোটে তাড়াহুড়ো করে যোগ না দিয়ে সমঝোতা ও ভারসাম্যের কূটনীতি অনুসরণ করাই প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সরাসরি কার্গো জাহাজ চলাচলসহ ব্যবসায়িক যোগাযোগও বাড়ছে। তবে এই সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয় আবেগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক আর সামরিক জোট— দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
তুরস্কের সঙ্গেও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতা বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নত করা সম্ভব, কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া ছাড়াও। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভারসাম্য বজায় রাখা। কোনো একক পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য যুক্তিযুক্ত। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বা এ ধরনের যেকোনো আঞ্চলিক কাঠামোর ক্ষেত্রে তাই দেখতে হবে, এতে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনীতি ও বাণিজ্য কতটা সুবিধা পাবে।
বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক শক্তিকে ঘিরে নয়; অর্থনীতি ও প্রযুক্তিও এর বড় ক্ষেত্র। বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দারিদ্র্যের হার কমানো, রফতানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা। সামরিক জোটের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব বাড়ানো বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো সামরিক জোটের সদস্য হলে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক বিরোধ বা নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে। তাই এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাও জরুরি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চুক্তির আওতায় তিন দেশ ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর রিয়াদে তিন দেশের সামরিক প্রধানদের বৈঠকে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ককে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ তৈরি করা বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য যুক্তিযুক্ত হবে না।
তাই এ ধরনের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশকে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বড় পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া প্রয়োজন।
বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও হতে হবে বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী। কোনো সাময়িক আবেগ বা উত্তেজনার কারণে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। অর্থনীতির শক্তি বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগও বাড়ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখাই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে