মধু পূর্ণিমা বুদ্ধের শিক্ষা

শতদল বড়ুয়া

মতামত

আজ শুভ মধু পূর্ণিমা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মধু পূর্ণিমা পালন করবেন। বুদ্ধপূজার

2026-09-26T05:30:57+00:00
2026-09-26T05:30:57+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
মধু পূর্ণিমা বুদ্ধের শিক্ষা
শতদল বড়ুয়া
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজ শুভ মধু পূর্ণিমা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মধু পূর্ণিমা পালন করবেন। বুদ্ধপূজার অন্যতম প্রধান উপকরণ মধু। ভোররাত থেকে বিশ্ব শান্তি কামনায় বিশেষ সূত্র পাঠের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। কোনো কোনো বিহার থেকে শান্তি শোভাযাত্রা বের করা হবে। বিকালে প্রতিটি বিহারে খণ্ডকালীন ভাবনা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের কলকাকলিতে মুখর থাকবে বিহার প্রাঙ্গণ।

মধু পূর্ণিমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বুদ্ধের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তৎকালীন সময়ে ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়ে দুই ভিক্ষু প্রচণ্ড কলহে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এর প্রভাব গ্রামবাসীদের মধ্যেও পড়ে। তথাগত বুদ্ধ বিবাদ মেটাতে এবং গ্রামবাসীদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে সবাইকে উপদেশ দিলেন। কিন্তু এতে কারও বোধোদয় না হওয়ায় বুদ্ধ পারিলেয়্যরক্ষিত বনে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করলেন।

গ্রামবাসী বিহারে গিয়ে বুদ্ধকে না পেয়ে বুঝতে পারলেন, ভিক্ষুরা বড় অন্যায় করেছেন। কৌশম্বীর ঘোষিতারামের আরামে দুই ভিক্ষুর মধ্যে বিনয়বিধান নিয়ে মতবিরোধের কারণে গ্রামবাসীরা এর বিহিত করার জন্য ভিক্ষুসংঘের প্রতি অনুরোধ জানালেন। গ্রামবাসীর চাপের মুখে ভিক্ষুসংঘও বুঝতে পারল, তারা ভুল করেছে। তখন বুদ্ধের দশম বর্ষাবাস চলছিল। তিনি পারিলেয়্যরক্ষিত বনে এই বর্ষাবাস পালন করছিলেন।

বুদ্ধ পারিলেয়্যরক্ষিত বনের ভদ্রশাল বৃক্ষের নিচে বর্ষাবাস শুরু করলে একটি হাতি নিজের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মনের দুঃখে বনে বনে ঘুরছিল। হঠাৎ বুদ্ধকে দেখে হাতিটির মনে শিহরণ জাগল। দূর থেকে বুদ্ধের কার্যকলাপ দেখে অভিভূত হয়ে সে তার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে সব দুঃখ ভুলে যেতে চাইল। বুদ্ধও হাতিটির মনোভাব বুঝতে পেরে তার শান্ত ও স্থির থাকার জন্য আশীর্বাদ করলেন। অহোরাত্র হাতিটি বুদ্ধের সেবায় নিয়োজিত থাকল। রাতে বুদ্ধ ঘুমালে হাতিটি সারা রাত তার চারপাশে চক্কর দিত, যাতে কোনো হিংস্র প্রাণী বুদ্ধকে আক্রমণ করতে না পারে।

প্রতিদিন সকালে বুদ্ধ যখন ভিক্ষাপাত্র হাতে বন থেকে বের হয়ে লোকালয়ে যেতেন, তখন হাতিটি নিজের শুঁড়ে ভিক্ষাপাত্র ধারণ করে তাকে লোকালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিত। এরপর পথিমধ্যে অপেক্ষা করত এবং বুদ্ধকে সঙ্গে নিয়ে আবার বনে ফিরে আসত। অবসর সময়ে হাতিটি বুদ্ধের জন্য বন থেকে ভালো ভালো ফল এনে দিত। হাতির এই কর্মকাণ্ড একটি দলছুট বানর গাছের ডালে বসে পর্যবেক্ষণ করত। এক পর্যায়ে বানরটিও বুদ্ধকে কিছু দান করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।

একদিন বানরটি হঠাৎ একটি গাছের মগডালে মৌচাক দেখতে পেল। সে আনন্দিত হয়ে বুদ্ধকে সেই মৌচাক দান করার সিদ্ধান্ত নিল। বানরটি মৌচাকটি এনে বুদ্ধের পাশে রেখে আড়ালে গিয়ে দেখতে থাকল, বুদ্ধ মধু পান করছেন কি না। বুদ্ধ মৌচাকটি স্পর্শ না করায় বানরটি কয়েকবার নেড়েচেড়ে সেটি বুদ্ধের অন্য পাশে রাখল। এবারও বুদ্ধ না নেওয়ায় বানরটি কাছে গিয়ে মৌচাকটি হাতে নিল এবং ভেতরের পোকাগুলো বের করে আবার বুদ্ধের পাশে রেখে নীরবে আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এবার বুদ্ধ মৌচাকটি হাতে নিয়ে মধু পান করছেন দেখে বানরটি পরম আনন্দে আত্মহারা হয়ে এগাছ থেকে ওগাছে লাফালাফি শুরু করে দিল। একপর্যায়ে গাছের ডাল ভেঙে নিচে পড়ে বানরটি মৃত্যুবরণ করল। সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যের প্রভাবে সে দেবপুত্ররূপে নবজন্ম লাভ করল। কথিত আছে, সেদিন ছিল আজকের মধু পূর্ণিমা তিথি।

এভাবে বুদ্ধের বনে তিন মাস কেটে গেল। বুদ্ধকে বন থেকে বিহারে ফিরিয়ে আনার জন্য পাঁচশ ভিক্ষুসহ অসংখ্য গ্রামবাসী বনে উপস্থিত হলেন। বুদ্ধ সবার মনোভাব বুঝতে পেরে গ্রামে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু হাতিরাজ বুদ্ধের সঙ্গে যেতে রাজি হলো না। বরং বুদ্ধকে বনে রেখে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল।

তখন তথাগত বুদ্ধ বললেন, ‘হে পারিলেয়্য হাতি, এ যাত্রায় তুমি আর আমাকে বাধা দিয়ো না। এখন আমার গ্রামে ফিরে যাওয়া একান্ত কর্তব্য। তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন থেকে তিন মাস আমার সেবা করেছ। এটাই তোমার জীবনের পরম প্রাপ্তি।’

বুদ্ধের এ কথায় হাতিটি স্থির হয়ে গেল। সে আর কোনো বাধা দিল না। পারিলেয়্য বন থেকে তথাগত ভগবান বুদ্ধ, ভিক্ষুসংঘ ও গ্রামবাসী যাত্রা করলেন। বুদ্ধ দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর শোক সহ্য করতে না পেরে হাতিটির হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ হয়ে গেল। কথিত আছে, এরপর পারিলেয়্য হাতি দেবপুত্ররূপে তুষিত স্বর্গে জন্ম নেয়। অতঃপর শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে সব ভিক্ষু একত্রিত হয়ে নিজ নিজ অপরাধের জন্য পরস্পরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে প্রায়শ্চিত্ত করলেন। 

সেই মিলন উৎসবে তথাগত বুদ্ধ নিম্নের শ্লোকটি আবৃত্তি করেছিলেন—‘মূর্খেরা জানে না কভু কবে আমাদের মৃত্যু হবে, জানিবে যাহারা তাহা, কলহ তাদের সাম্য হবে।’

লেখক : প্রাবন্ধিক

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   মধু পূর্ণিমা  বুদ্ধের শিক্ষা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: