অনিশ্চয়তার দোলাচালে দুলছে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প। এমআরটি লাইন-১-এর প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মূল সুড়ঙ্গ ও স্টেশন নির্মাণের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজ এখনও দরপত্র, মূল্যায়ন, দরকষাকষি বা অনুমোদন পর্যায়ে আছে।
ঢাকার বর্তমান মেট্রোরেল ব্যবস্থায় নগরবাসী দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের সুফল পাচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন রুটগুলো হতে পারে যানজট কমানোর কার্যকর অবকাঠামো। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা পুনর্গঠন, কর্মঘণ্টার অপচয় কমানো এবং নগর বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক।
লাইন-১-এর ১২টি প্যাকেজের মধ্যে গত ৩০ জুন পর্যন্ত শুধু ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে। প্যাকেজ-৯-এ সর্বনিম্ন দরদাতা দরপত্রের মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার দর প্রথমটির চেয়ে প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি। প্যাকেজ-৫-এও দীর্ঘসূত্রতার কারণে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রায় ৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকার প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ করতে অপারগতা জানিয়েছে।
প্যাকেজ-৩-এ কোনো প্রি-কোয়ালিফায়েড দরদাতা দরপত্র জমা না দেওয়ায় পুনঃদরপত্রের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে ২, ৪, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর প্যাকেজেও বিভিন্ন মূল্যায়ন, দরকষাকষি ও জাইকার সম্মতির প্রক্রিয়া চলছে। ফলে বিপুল অর্থবরাদ্দ থাকলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং আর্থিক ব্যয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।
দরপত্র আহ্বান থেকে চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত সময় যত দীর্ঘ হয়, ততই নির্মাণসামগ্রীর দাম, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, শ্রম ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বদলে যায়। ফলে দরপত্রের সময় যে দর প্রতিযোগিতামূলক ছিল, দীর্ঘ বিলম্বের পর সেটিই ঠিকাদারের কাছে আর বাস্তবসম্মত না-ও থাকতে পারে। প্যাকেজ-৯ তারই উদাহরণ।
আবার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার দর ৭১ শতাংশ বেশি হলে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। অন্যদিকে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করলে সময় আরও বাড়বে। নতুন দর আরও বেশি হওয়ার ঝুঁকি তো আছেই। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রশাসনিক বিলম্বে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে।
ডিএমটিসিএল বিদ্যমান দরদাতার সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এই দরকষাকষি যেন প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়ার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। পাশাপাশি প্যাকেজ-৯-এর ক্ষেত্রে কেন দরপত্র মূল্যায়ন ও জাইকার পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তিতে এত সময় লাগল সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রতিটি প্যাকেজের জন্য একটি সমন্বিত ক্রয় ও বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার।
সরকার চলতি অর্থবছরে এমআরটি লাইন-১-এর জন্য ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই বরাদ্দ আগের অর্থবছরের সংশোধিত ৮০১ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় নয়গুণ বেশি। এই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পাতাল মেট্রোরেলের মতো জটিল প্রকল্পে কিছু অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সে জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ বিঘ্নিত হতে পারে। তবে প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরুর তিন বছরের বেশি সময় পরও যদি মূল অবকাঠামোর বড় অংশ চুক্তি সম্পাদনের পর্যায়ে আটকে থাকে, তা হলে সেটিকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক জট হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় জনগণকে। প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়া মানে রাজধানীতে যাতায়াত-যোগাযোগে নাগরিকদের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হওয়া। পাতাল মেট্রোরেল ভবিষ্যৎ নগর পরিবহনের অন্যতম ভিত্তি। তাই প্যাকেজে প্যাকেজে সৃষ্ট জট থেকে এই প্রকল্পকে অবিলম্বে উদ্ধার করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি