শিল্প, কৃষি, পরিবহন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ। শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে এর স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই বাস্তবতায় আগামী ১০ বছরের জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের যে ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্যাসের বিদ্যমান ঘাটতিতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল বকেয়া এবং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার আর্থিক বোঝার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়ায় পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খেয়াল করেছি, কিছু দিন ধরে কিছু মানুষ এই ব্যাপারে (জ্বালানি ) বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ভঙ্গুর দশা এক দিনে তৈরি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যেসব ভ্রান্তনীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তারই মাশুল গুনতে হচ্ছে আজকে দেশের মানুষকে। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে অলস বসে থাকলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী তাদের বিশাল অঙ্কের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দেওয়া হয়েছে। গত ১৫ বছরে শুধু এই খাতেই প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা অপচয় বা লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের প্রকৃত চাহিদার তোয়াক্কা না করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে ২৫ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের খরচ ও মেয়াদ বারবার বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কাঠামোগত অনিয়মের ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিগত সরকার আমলে দেশীয় গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধানে মনোযোগ না দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। শিল্প-কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাসের অর্ধেকও না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও প্রাথমিক জ্বালানির জোগান সেই অনুপাতে বাড়েনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট জ্বালানির ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। সেটাও অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য। সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়। বরং জ্বালানি অনুসন্ধান, সরবরাহ, আমদানি, সঞ্চালন, মূল্য নির্ধারণ ও বিনিয়োগ- পুরো ব্যবস্থাই নানা সংকটে জর্জরিত। এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিকল্পনা করা অত্যন্ত জরুরি।
জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সরকারকে ভবিষ্যতের জন্য বহুমুখী ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। নতুন জ্বালানি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হতে হবে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। আবার এ ক্ষেত্রে সতর্কও হতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কোনো ভুলনীতি বা পদক্ষেপের কারণে জনগণকে যেন তার মূল্য দিতে না হয়। অতীত সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতির বোঝা ইতিমধ্যে জনগণের ঘাড়ে চেপে আছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে