বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। যা বিগত দুই বছর যাবৎ আমরা লক্ষ করছি। এই বন্ধ্যত্ব কাটানোর জন্য বর্তমান সরকার নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। যা প্রাথমিক পর্যায়ে নানা আশার আলো ছড়ালেও তা ছিল অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য এক ধরনে ধোঁয়াশার মতো।
গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ফলে তা বর্তমানে এক ফলপ্রসূর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্নে নতুন এক দিগন্তের সন্ধান দেখাচ্ছে দেশের বিনিয়োগের পাইপলাইন। ইনভেস্ট বাংলাদেশ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে, দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বিনিয়োগের উৎসগুলো বৈচিত্র্যময়— চীন, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রতিটি অঞ্চল থেকেই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়— চীন থেকে আসা বিনিয়োগের পরিমাণ ৬০০ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিনিয়োগগুলো মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে কেন্দ্রীভূত, যা দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।
সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, নতুন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জন্য আলোচনা, মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের কাজ এগিয়ে চলা— এসব প্রকল্প দেশের বহুমুখী উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে। এর ফলে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিতের বিস্তৃতি ঘটবে।
বিশেষ করে, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপি প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের বিনিয়োগের জন্য নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, ফেনীর জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ও অ্যাকুয়াকালচার জোনের উন্নয়ন— এসব প্রকল্প দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিপ্লবের সূচনা করবে। এর পাশাপাশি দেশের প্রথম সমন্বিত বিনিয়োগ মানচিত্রায়ণ কার্যক্রম দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক নির্দেশনা দিচ্ছে।
বিনিয়োগের এই প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা ও সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। ১.২৫ শতাংশ প্রণোদনা, শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং বিনিয়োগের জন্য সহজ প্রক্রিয়া কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উপযোগী ও আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো। তবে একই সঙ্গে বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে আগ্রহ এবং বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এই বিনিয়োগ পাইপলাইন দেশের উন্নয়নের নতুন দিক নির্দেশ করবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সরকারের সুদৃঢ় ভূমিকা নিশ্চিত করছে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্জন নতুন উচ্চতায় উঠবে, যা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সমাজের সব স্তরে সমৃদ্ধি ও উন্নতি বয়ে আনবে— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে