অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল
গ্রাফিক : সময়ের আলো দেশের মানুষের তখন প্রতীক্ষা ছিল এমন একজন নেতার, যিনি এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দিতে শক্ত হাতে দেশের হাল ধরবেন। আর সেনাবাহিনীর প্রত্যাশা ছিল তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব।
খালেদ মোশাররফের হাতে জেনারেল জিয়ার বন্দিত্ব তারা সহজে মেনে নেয়নি। ফলে সিপাহি ও জনতা উভয়ের প্রত্যাশার একক ঠিকানা হয়ে ওঠে একটি নাম— জিয়াউর রহমান। দেশপ্রেমিক সৈনিকরা ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে বন্দিত্ব থেকে
মুক্ত করেন তাদের উপযুক্ত প্রধান জেনারেল জিয়াকে।
৭ নভেম্বর নিয়ে গত দেড় যুগ ধরে নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে, ছড়ানো হয়েছে বিভ্রান্তি। এমনকি সাধারণ ছুটির সরকারি তালিকা থেকেও ৭ নভেম্বরকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে এ দিনটি নিয়ে কোনো কথা বা আলোচনা না হতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই দিনটি নিয়ে এত বিরাগ? ৭ নভেম্বর কি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি সংখ্যা? আসলেই কি সেটি সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব? ৭ নভেম্বর কি অনিবার্য ছিল? এই বিপ্লবের কতটা নির্মোহ বিশ্লেষণ হয়েছে এত দিন?
একটু পেছন থেকে শুরু করা যাক। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তার পরিবারের সদস্যসহ নিহত হন। যেকোনো হত্যাকাণ্ডই মর্মান্তিক, বলাই বাহুল্য। কিন্তু দেশের জনগণ, এমনকি তার দলও সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদী হলো না। পরদিনের পত্রিকাগুলোর শিরোনামে অবিসংবাদিত নেতৃত্বের গুণগান তো দূরের কথা, নিতান্ত সাদামাটা শোকগাথাও প্রকাশিত হলো না।
বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর সরকার নিয়ন্ত্রিত দুটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি মিলিয়ে তখন পত্রিকার সংখ্যা ছিল চারটি। সেদিন ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ’। এর প্রথম পাতার প্রথম কলামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’। দৈনিক বাংলা শিরোনাম করেছিল ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি’ আর সম্পাদকীয়তে শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’।
আগের দিন ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ কিংবা খবর নেই বরং ইতিবাচক পরিবর্তনের গুণগান। সে সময় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ, যিনি পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য হন।
১৫ আগস্ট থেকে কার্যকারিতা ধরে ২০ আগস্ট, ১৯৭৫ খন্দকার মোশতাক সামরিক শাসন জারি করেন। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ তখনও বহাল ছিল। সংবিধান নিয়ে কোনো কথা ছিল না। সব বাহিনীর প্রধান মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য ও সহযোগিতার প্রত্যয় ঘোষণা করেন প্রচারমাধ্যমে।
আগস্টের পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা ট্যাঙ্ক ও ভারী অস্ত্র নিয়ে বঙ্গভবনে ঘাঁটি গাড়েন। বলতে গেলে, তারা সেনাবাহিনীর কমান্ডের বাইরে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের একান্ত সান্নিধ্যে অবস্থান করছিলেন। দেশে তখন চরম অনিশ্চয়তা। তিয়াত্তর-চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের প্রভাব তখনও শেষ হয়নি। রাস্তায় কঙ্কালসার, অনাহারপীড়িত মানুষের মরদেহ পড়ে থাকত যত্রতত্র। নিত্যপণ্য বাজার থেকে উধাও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছিল।
এর মধ্যে ২৫ আগস্ট, ১৯৭৫ উপপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ হন রাষ্ট্রদূত। চতুর খন্দকার মোশতাক জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করলেও তার প্রতি অন্ধ আনুগত্যে আস্থা রাখতে পারেননি। ফলে সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি করে সেনাবাহিনীতে জেনারেল জিয়ার কমান্ড প্রতিষ্ঠার অন্তরায় সৃষ্টি করতে তার ওপরে বসিয়ে দিলেন আরও দুজনকে। জেনারেল খলিলুর রহমানকে নিযুক্ত করলেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে, যিনি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। আরও নিচ্ছিদ্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে জেনারেল ওসমানীকে দিলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার পদ। তারা দুজনই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেনারেল জিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে নানা অজুহাতে অসহযোগিতা করতেন।
একই সময়ে সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও ৪৬ ব্রিগেডের প্রধান শাফায়াত জামিল সেনাবাহিনীতে কমান্ড ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সেনাপ্রধানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেনাবাহিনীতে ভিন্ন ধারা প্রতিষ্ঠার একটি সাজানো পরিকল্পনার পক্ষে জোরেশোরে মাঠে নামেন।
২ নভেম্বর রাতে ৪৬ ব্রিগেডের সহায়তায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ শুরু হয়। বন্দি হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া খালেদ মোশাররফ সারা দিন ধরনা দিয়ে খন্দকার মোশতাকের কাছে সেনাপ্রধান পদে নিয়োগের কৃপা প্রার্থনা করে ৩ নভেম্বর রাতে সফল হন।
৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রাশেদ মোশাররফ ও তাদের মা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সমর্থনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিছিল নিয়ে পুষ্পমাল্য দিতে যান ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। ৩ নভেম্বর রাতে সংঘটিত হয় জেলহত্যা। একই রাতে খালেদ মোশাররফদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে ফারুক, রশিদ, ডালিম, হুদা, নূর, পাশা ও মোসলেহ উদ্দিনরা বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ-২৭ ফ্রেন্ডশিপ বিমানে সপরিবারে ও ব্যক্তিগত মালামালসহ নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় উড়ে যান ব্যাংককে। এমনকি দীর্ঘ পথ ফকার বিমানটি একবারে পাড়ি দিতে পারবে না বলে চট্টগ্রামে একবার জ্বালানি ভরার ব্যবস্থাও করা হয় পরিকল্পনা অনুযায়ী।
সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে ব্যক্তিস্বার্থের এসব কর্মকাণ্ড সাধারণ সৈনিকরা মোটেও পছন্দ করেননি। তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফের তথাকথিত অভ্যুত্থান ও তার সমর্থনে উল্লসিত আওয়ামী লীগের মিছিল স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত বাংলাদেশে শান্তির নিশ্বাস নেওয়া দেশবাসীকে বাকশালী নির্যাতনের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কায় শঙ্কিত করে তোলে। তারাও এই অপশক্তির হাত থেকে পরিত্রাণের প্রতীক্ষায় ছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফার প্রচার।
দেশের মানুষের তখন প্রতীক্ষা ছিল এমন একজন নেতার, যিনি এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দিতে শক্ত হাতে দেশের হাল ধরবেন। আর সেনাবাহিনীর প্রত্যাশা ছিল তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব।
খালেদ মোশাররফের হাতে জেনারেল জিয়ার বন্দিত্ব তারা সহজে মেনে নেয়নি। ফলে সিপাহি ও জনতা উভয়ের প্রত্যাশার একক ঠিকানা হয়ে ওঠে একটি নাম— জিয়াউর রহমান। দেশপ্রেমিক সৈনিকরা ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন তাদের উপযুক্ত প্রধান জেনারেল জিয়াকে। আর স্বতঃস্ফূর্ত জনতা ও দেশবাসী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের মতো আবারও আশ্বস্ত হয় যে, দেশের ক্রান্তিকালে পরীক্ষিত ও অসীম সাহসী দেশপ্রেমিক সেদিনের মেজর জিয়া ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে আবারও এই অনিশ্চিত সময়েই দেশের হাল ধরেছেন।
জাসদ-সমর্থিত সৈনিকদের একটি দল কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুদের প্ররোচনায় ১২ দফা দাবির পাশাপাশি অদ্ভুত কিছু সেøাগান দিয়ে ঢাকা সেনানিবাসকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে— ‘সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’। এই রক্তের হোলিতে নারী চিকিৎসকসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন।
৭ নভেম্বরের পর বিশৃঙ্খল ও দিশাহীন বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল জিয়াউর রহমানের সামনে। পূর্বঘোষিত সামরিক শাসনামলের প্রধান ছিলেন বিচারপতি আবু সায়েম। জিয়া ও অন্যান্য বাহিনীর প্রধানরা ছিলেন উপপ্রধান। একটি তাত্ত্বিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আমাদের সামনে এখনও রয়েছে।
৭ নভেম্বর না এলে বাংলাদেশের কী হতো? আমাদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা সেদিন অবশ্যই ছিল। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসার আশঙ্কাও ছিল।
একদলীয় বাকশালের নিষ্পেষণে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা হয়তো আজন্ম অধরাই থেকে যেত। এসব অবশ্যম্ভাবী আশঙ্কা সত্যি হয়নি, সেটি হয়তো আমাদের অদেখা স্বস্তি। কিন্তু ৭ নভেম্বর থেকে আমাদের প্রাপ্তির তালিকা অনেক দীর্ঘ।
১. ৭ নভেম্বর আমাদের মুক্তি দিয়েছে একদলীয় বাকশালের দুঃশাসন থেকে।
২. দিয়েছে চারটি সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশনার পরিবর্তে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।
৩. দিয়েছে অভিন্ন জাতীয়তার পরিচয় : ধর্ম-বর্ণ, গোত্র-গোষ্ঠী, ভাষা-সংস্কৃতি, পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে সমঅধিকারের জাতীয়তা ‘বাংলাদেশি’।
৪. সমাজতন্ত্রের সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ধারণার বিপরীতে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য ও অবারিত মুক্তবাজার অর্থনীতি।
৫. আমাদের বেকার যুবশক্তির জন্য খুলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার। নারীদের জন্য সৃষ্টি করেছে স্বাধীন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ।
৬. সাহায্যনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত।
৭. দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে।
৮. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার সঙ্গে সমাদৃত হয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে।
৯. মুসলিম বিশ্বে পেয়েছে সম্মানের আসন। ওআইসির গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে পেয়েছে দায়িত্বপূর্ণ পদ। আর সবকিছুকে ছাপিয়ে নিশ্চিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। যুগে যুগে এভাবেই ইতিহাস বীরত্বগাথা লেখে আর একটি জাতি ক্রান্তিলগ্নে পায় তার যোগ্য সন্তানকে। ৭ নভেম্বর আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের মতোই আরেকটি অমর বীরত্বগাথা। সিপাহি-জনতার ঐক্য ও সংহতি প্রকাশের এক অনন্য ইতিহাস। ঐক্যের এই স্রোতধারা অব্যাহত থাকলে নিরাপদ থাকবে বাংলাদেশ, নিরাপদ থাকবে আমাদের ভূখণ্ড ও সীমান্ত, নিরাপদ থাকবে আমাদের আগামীর প্রজন্ম।
লেখক : আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসকে