গ্রাফিক : সময়ের আলো জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে প্রতিদিন এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও নিরাপত্তা কেড়ে নিচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এই সংকটের ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে। সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নানা ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বসবাস করছেন বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে।
ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং উপকূলীয় এলাকার বিস্তৃতির কারণে বাংলাদেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতি বছর দেশের বহু মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারাচ্ছেন। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে।
কৃষিজমি ও সুপেয় পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক ও জেলে জীবিকার উপায় হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বস্তিতে জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের চাপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নগর ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সংকটও তৈরি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর। কোনো দুর্যোগে ঘরবাড়ি, ফসল কিংবা কাজ হারালে তাদের পক্ষে নতুন করে জীবন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি। তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায়। বিশুদ্ধ পানির অভাবে বাড়ে নানা রোগ। লবণাক্ত পানি ও অপুষ্টি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। এ কারণে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলো কয়লা, তেল ও গ্যাস পুড়িয়ে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের খেসারত দিতে হচ্ছে পৃথিবীকে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির বড় অংশ এসব দেশকেই বহন করতে হচ্ছে। এ জন্য জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেসব দেশ বেশি দূষণ করেছে, তাদেরই বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
এখানেই জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দেওয়া অর্থের মাত্র ১০ শতাংশের মতো পৌঁছায় সংঘাত ও সংকটে থাকা দেশগুলোতে। অথচ এসব দেশেই সহায়তার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজনের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। সমস্যা হচ্ছে, ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ দিচ্ছে না। কেবল বৈশ্বিক সম্মেলনে আশ্বাস দেওয়া কিংবা নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে এই সংকটের সমাধান হবে না।
প্রতিশ্রুত অর্থ সহজশর্তে ও সময়মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছাতে হবে। ঋণের বোঝা বাড়িয়ে জলবায়ু সহায়তা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অনুদান ও সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতিও জোরদার করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একটি দেশের একার সমস্যা নয়। এর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিযোজন ও পুনর্বাসনে ন্যায্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে