চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা ও অসম বাজারব্যবস্থা

মো. তাহমিদ রহমান

মতামত

কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সংরক্ষণ, পরিবহন, রাসায়নিক উপকরণ, শ্রম ও বিদ্যুতের খরচ রয়েছে। চূড়ান্ত পণ্য তৈরিতে যুক্ত হয় নকশা, সেলাই,

2026-11-09T04:37:20+00:00
2026-11-09T04:37:20+00:00
 
  সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬,
২৫ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা ও অসম বাজারব্যবস্থা
মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সংরক্ষণ, পরিবহন, রাসায়নিক উপকরণ, শ্রম ও বিদ্যুতের খরচ রয়েছে। চূড়ান্ত পণ্য তৈরিতে যুক্ত হয় নকশা, সেলাই, বিপণন ও অন্যান্য ব্যয়। এর সঙ্গে কর ও মুনাফাও যোগ হয়। কিন্তু এসব ব্যয় কাঁচা চামড়ার অস্বাভাবিক কম দামকে ন্যায্যতা দেয় না। উৎপাদন ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব ও বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা না থাকলে মূল্য ব্যবধানের প্রকৃত কারণ বোঝা কঠিন।

আমরা কোনো সমস্যা সামনে এলে আলোচনা ও প্রতিবাদে সরব হই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম— সবখানেই চলে বিতর্ক। কিন্তু কিছুদিন পর সেই উত্তাপ কমে যায়। আড়ালে পড়ে থাকে মূল সমস্যা। কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও বিপণনব্যবস্থার অনিয়ম তার একটি উদাহরণ। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় বিপুলসংখ্যক পশু কুরবানি দেওয়া হয়। এসব পশুর চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এই চামড়া বিক্রি হয় নামমাত্র দামে। কোথাও ক্রেতা না পেয়ে ফেলে দেওয়া হয়, এমনকি মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। অন্যদিকে, বাজারে চামড়ার জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কাঁচামালের দাম ও চূড়ান্ত পণ্যের মূল্যের এই ব্যবধান বাজারব্যবস্থার একটি বড় অসংগতির ইঙ্গিত দেয়।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রফতানিমুখী শিল্প। একসময় রফতানি আয়ের বিবেচনায় তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়েও এগিয়ে ছিল এই খাত। ১৯৪০ সালে নারায়ণগঞ্জে রণদা প্রসাদ সাহা প্রথম ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ঢাকার হাজারীবাগে গড়ে ওঠে ট্যানারি শিল্প। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অর্থনীতিতে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। নব্বইয়ের দশক থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার পাশাপাশি জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে রফতানিতে বৈচিত্র্য আসে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাতের রফতানি আয় ছিল প্রায় ১২৬ কোটি ডলার। পরবর্তী কয়েক বছরেও আয় ১০০ কোটি ডলারের ওপরে ছিল।

তবে সম্ভাবনা অনুযায়ী এই শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পর রফতানি আয় কমতে শুরু করে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর, পরিবেশগত অবকাঠামোর দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক মান পূরণে ব্যর্থতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এ সংকটকে বাড়িয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আয় ছিল প্রায় ১১৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় আয় বাড়লেও এক দশক আগের তুলনায় প্রবৃদ্ধি খুব বেশি নয়। বিপুল কাঁচামাল ও শ্রমশক্তি থাকার পরও এই সীমিত অগ্রগতি শিল্পটির কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে আনে।

প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে সরকার কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। ২০২৬ সালে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মূল্য ঘোষণা করলেই বাজারে তা কার্যকর হয় না। বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে চামড়া বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। মৌসুমি সংগ্রাহক, এতিমখানা ও মাদরাসার প্রতিনিধিরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকলেও তা বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেই।

কাঁচা চামড়ার দাম ও চামড়াজাত পণ্যের খুচরা দামের মধ্যে সরাসরি তুলনা করা অবশ্য ঠিক নয়। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সংরক্ষণ, পরিবহন, রাসায়নিক উপকরণ, শ্রম ও বিদ্যুতের খরচ রয়েছে। চূড়ান্ত পণ্য তৈরিতে যুক্ত হয় নকশা, সেলাই, বিপণন ও অন্যান্য ব্যয়। এর সঙ্গে কর ও মুনাফাও যোগ হয়। কিন্তু এসব ব্যয় কাঁচা চামড়ার অস্বাভাবিক কম দামকে ন্যায্যতা দেয় না। উৎপাদন ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব ও বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা না থাকলে মূল্য ব্যবধানের প্রকৃত কারণ বোঝা কঠিন।

ঈদুল আজহার সময় অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে আসে। কাঁচা চামড়া দ্রুত পচনশীল হওয়ায় 
যথাসময়ে লবণ প্রয়োগ ও সংরক্ষণ জরুরি। তা না হলে চামড়ার মান নষ্ট হয়। বিক্রেতার হাতে সময় কম থাকায় ন্যায্য দামের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগও সীমিত থাকে। অন্যদিকে যেসব ক্রেতার সংরক্ষণাগার, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের সুবিধা রয়েছে, তারা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন। ফলে দর-কষাকষিতে বিক্রেতারা পিছিয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে শুধু দাম ঘোষণা নয়, বাজারে বিকল্প ক্রেতা তৈরি, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত এবং ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত অবকাঠামো এ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর করা হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু পণ্যের দাম ও গুণগত মান বিবেচনা করা হয় না; পরিবেশ সুরক্ষা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণের প্রমাণ চায়। প্রয়োজনীয় সনদ ও মান অর্জন করতে না পারায় বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ হারাচ্ছে।

এর প্রভাব কাঁচা চামড়ার বাজারেও পড়ে। উন্নতমানের প্রক্রিয়াজাত চামড়া উৎপাদন ও রফতানি করতে না পারলে দেশীয় কাঁচামালের সম্ভাব্য মূল্য পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। তাই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার সঙ্গেও যুক্ত।

এই শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্র, শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর করতে হবে এবং কঠিন বর্জ্যরে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্যানারিগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ ও মান অর্জনে সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি, উন্নত নকশা ও পণ্যের গুণগত মান বাড়াতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ঈদুল আজহার সময় চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চামড়ার মূল্যশৃঙ্খলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত পণ্য বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ের ব্যয় ও মূল্য সংযোজনের হিসাব পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে কাঁচামালের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ সহজ হবে এবং বাজারে অযৌক্তিক মূল্য ব্যবধানের কারণও চিহ্নিত করা যাবে। চামড়ার বর্জ্য ও উপজাত ব্যবহার করে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।

চামড়া কেবল একটি শিল্পের কাঁচামাল নয়, এটি জাতীয় সম্পদ। ঈদুল আজহায় যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এই সম্পদের একটি অংশ নষ্ট হলে ক্ষতি হয় পুরো অর্থনীতির। ক্ষতিগ্রস্ত হন চামড়া সংগ্রাহক, এতিমখানা, মাদরাসা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও শিল্পমালিক। তাই কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়ানোকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি কার্যকর ও ন্যায্য মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে পারলেই এই সম্ভাবনাময় শিল্পের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব।

লেখক : শিক্ষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   চামড়া  শিল্প  বাজারব্যবস্থা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: