গ্রাফিক : সময়ের আলো উন্নয়নের সুফল বণ্টনের বিষয়টি অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধি কত হলো, মাথাপিছু আয় কত বাড়ল কিংবা কত বড় অবকাঠামো নির্মিত হলো— এসব সূচকের পাশাপাশি কত মানুষের আয় বেড়েছে, কতটি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং কত পরিবার দারিদ্র্য থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে এসেছে, তারও হিসাব রাখতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গল্পে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি— সবই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু উন্নয়নের এই পরিসংখ্যানের পাশে যখন বাড়তে থাকা দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের চাপে বিপর্যস্ত পরিবারের চিত্র উঠে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— মানুষের প্রকৃত আয় কতটা বেড়েছে, কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হয়েছে, খাদ্য-চিকিৎসা-শিক্ষার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা কতটা উন্নত হয়েছে এবং কত মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসে নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু একই সময়ে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট অর্থনীতির ভিন্ন একটি বাস্তবতা তুলে ধরছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, বিশ্বব্যাংক বলেছে, ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
একই অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে আইএমএফের পূর্বাভাস; সরকারের লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আইএমএফের ধারণা, পরের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশ হবে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়লেও ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্যর হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন, যেকোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কায় যাদের আবার দরিদ্র হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ দারিদ্র্য শুধু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়; এটি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবার ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত অবস্থায় রয়েছে। এ শ্রেণির মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। তারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও সামান্য আয়হানি, অসুস্থতা কিংবা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। জরিপে মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মাস শেষে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা, বিপরীতে ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে পরিবারগুলোকে ঋণ করতে হচ্ছে অথবা সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।
সর্বনিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ব্যয়েই চলে যায়। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় সংকুচিত হয়। চিকিৎসার ব্যয়ও বহু পরিবারের আর্থিক দুর্দশার অন্যতম কারণ। এ অবস্থায় দারিদ্র্য বিমোচন বলতে শুধু দরিদ্র মানুষের আয় সামান্য বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। পরিবারগুলো যাতে নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে না পড়ে, সেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের অভাব। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে, বিদ্যমান কারখানা বন্ধ হলে বা উৎপাদন না বাড়লে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ বড় ব্যবসায় রূপান্তর হওয়ার সুযোগ না পেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়ে। বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অমিলও কর্মসংস্থানের সংকট বাড়ায়। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের পরও অনেক তরুণ প্রত্যাশিত কাজ ও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ ব্যাংক খাতের দুরবস্থা। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে যা বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে আছে।
বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ি থাকায় ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উৎপাদনশীল ব্যবসায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফেরাতে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবহন সরবরাহ সেবার মতো খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং বাজারসংযোগের সুযোগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সঙ্গে শিল্পের চাহিদার সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে তরুণরা শুধু সনদ নয়, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করতে পারেন। পঞ্চমত করব্যবস্থার সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ, সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
উন্নয়নের সুফল বণ্টনের বিষয়টি অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধি কত হলো, মাথাপিছু আয় কত বাড়ল কিংবা কত বড় অবকাঠামো নির্মিত হলো— এসব সূচকের পাশাপাশি কত মানুষের আয় বেড়েছে, কতটি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং কত পরিবার দারিদ্র্য থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে এসেছে, তারও হিসাব রাখতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তব উন্নয়নে রূপ দিতে হলে পরিসংখ্যানের সাফল্যের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল জাতীয় আয়ের বৃদ্ধি নয় বরং সেই আয়ের সুফল কতটা মানুষের ঘরে পৌঁছাল, কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করল।
লেখক : ব্যাংক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব