সংস্কৃতির উৎসব আছে, সংস্কৃতি কোথায়?

সাইফুল ইসলাম

মতামত

বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট বোধহয় সংস্কৃতির অনুপস্থিতি নয়; সংকট হলো সংস্কৃতির নামে আমাদের যে বিপুল আয়োজন, তার ভেতরে সংস্কৃতির

2026-09-24T01:00:36+00:00
2026-09-24T01:00:36+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
সংস্কৃতির উৎসব আছে, সংস্কৃতি কোথায়?
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:০০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট বোধহয় সংস্কৃতির অনুপস্থিতি নয়; সংকট হলো সংস্কৃতির নামে আমাদের যে বিপুল আয়োজন, তার ভেতরে সংস্কৃতির ক্রমশ অনুপস্থিত হয়ে পড়া। চারদিকে অনুষ্ঠান আছে, মঞ্চ আছে, মাইক আছে, ব্যানার আছে, ক্যামেরা আছে, পৃষ্ঠপোষক আছে—শুধু সংস্কৃতির সেই অন্তর্গত অস্থিরতাটি নেই, যা মানুষকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করে এবং সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখায়।

আমরা সংস্কৃতিকে খুব সহজ একটি জিনিস বানিয়ে ফেলেছি। বৈশাখ এলে পান্তা-ইলিশ, একুশে এলে শহীদ মিনার, বসন্ত এলে হলুদ পোশাক, বিজয় এলে পতাকা, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে কয়েকটি গান, নজরুলজয়ন্তীতে কয়েকটি কবিতা—তারপর বছরভর নিশ্চিন্ত জীবন। যেন সংস্কৃতি কিছু নির্দিষ্ট দিবসের সাজসজ্জা, কিছু মুখস্থ কবিতা, কিছু গান এবং কয়েকটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার সমষ্টি। অথচ সংস্কৃতি কোনো উৎসবের পোশাক নয়; সংস্কৃতি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপন, চিন্তা, রুচি, নৈতিকতা, প্রতিবাদ, ভালোবাসা এবং অসহমতের ভিতরে বসবাস করে।

একটি সমাজের সংস্কৃতির স্বাস্থ্য বোঝা যায় সে সমাজ কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে, কতটা সাহসের সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে এবং কতটা উদারতার সঙ্গে ভিন্নমতকে জায়গা দিতে পারে—তা দিয়ে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আমরা সংস্কৃতির বাহ্যিক চিহ্নগুলো যত্ন করে রেখেছি, কিন্তু তার প্রাণটিকে ক্রমশ সংকুচিত করেছি।

বাংলা ভাষা আমাদের সংস্কৃতির প্রধান বাহন। কিন্তু ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা অনেক সময় ভাষার ব্যবহারেই প্রকাশ পায় না। আমরা মাতৃভাষার দিবস পালন করি, অথচ দৈনন্দিন জীবনে বাংলা লেখার শুদ্ধতা, সৌন্দর্য কিংবা গভীরতার প্রতি খুব বেশি মনোযোগী নই। বাংলা ভাষার সাহিত্যিক ঐশ্বর্যকে জানার চেয়ে আমরা ভাষাটিকে প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি আবেগময় বাক্য, কিছু ইংরেজি শব্দের বাহুল্য এবং অসংখ্য বানানভুলের মধ্যেই অনেকের বাংলা-প্রেমের সমাপ্তি ঘটে।

সংস্কৃতির আরেকটি বড় সংকট পাঠাভ্যাসের সংকট। যে সমাজ বই পড়ে না, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতিও হারাতে থাকে। বই কেবল তথ্য দেয় না; বই মানুষকে অন্য মানুষের জীবন অনুভব করতে শেখায়। উপন্যাস আমাদের অপরের দুঃখে প্রবেশ করতে শেখায়, কবিতা ভাষার গভীরতা শেখায়, ইতিহাস আমাদের ভুলের আয়না দেখায়, দর্শন প্রশ্ন করতে শেখায়। কিন্তু আমরা বইয়ের বদলে দ্রুত ভোগযোগ্য তথ্যের প্রতি ক্রমশ বেশি আকৃষ্ট হচ্ছি। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও এখন অনেকের কাছে কয়েক ঘণ্টার পাঠের বিকল্প হয়ে উঠেছে। ফলে জ্ঞানের পরিমাণ হয়তো বাড়ছে, কিন্তু চিন্তার গভীরতা কমছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি নিজে কোনো সাংস্কৃতিক শত্রু নয়। বরং এটি সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানোর অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, আমাদের ব্যবহারিক বোধে। আমরা প্রযুক্তিকে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার মাধ্যম না বানিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মপ্রদর্শনের আয়না বানিয়েছি। কে কোথায় গেল, কী খেল, কী পরল, কার সঙ্গে ছবি তুলল—এসব জানার আগ্রহে আমরা ব্যস্ত; কিন্তু কে কী লিখল, কী ভাবল, কী আবিষ্কার করল—সেটি জানার আগ্রহ ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের সর্বগ্রাসী প্রভাব। বাজার মানুষের রুচিকে শুধু অনুসরণ করে না; রুচি তৈরিও করে। যে গান সহজে বিক্রি হয়, সেটি বেশি বাজে; যে বই দ্রুত বিক্রি হয়, সেটি বেশি প্রচার পায়; যে ছবি বেশি ক্লিক পায়, সেটিই বেশি দৃশ্যমান হয়। ফলে সংস্কৃতির মূল্য নির্ধারণে নান্দনিকতা, চিন্তার গভীরতা বা মানবিকতার পরিবর্তে ‘রিচ’, ‘ভিউ’, ‘লাইক’ ও ‘এনগেজমেন্ট’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


এখানে শিল্পীও পুরোপুরি নির্দোষ নন। শিল্পীর স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রয়োজন। দর্শক কী চায়—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে শিল্পী যদি কেবল দর্শকের রুচির অনুসারী হয়ে যান, তাহলে শিল্প আর পথ দেখায় না; পথের ভিড়ের সঙ্গে হাঁটে। শিল্পের কাজ সবসময় মানুষকে আনন্দ দেওয়া নয়; কখনো কখনো অস্বস্তিতে ফেলা, প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো এবং প্রচলিত স্বস্তিকে নষ্ট করাও শিল্পের কাজ।

আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান বছরজুড়ে অসংখ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কিন্তু অনুষ্ঠান যত বাড়ে, সাংস্কৃতিক বিতর্ক তত বাড়ে না। মঞ্চে বক্তৃতা হয়, ফুল দেওয়া হয়, স্মারক প্রকাশিত হয়, ছবি তোলা হয়; কিন্তু শিল্প ও সমাজ নিয়ে গভীর আলোচনা কতটা হয়? নতুন লেখক, নতুন চিন্তক, নতুন শিল্পভাষা তৈরির জন্য কতটা ঝুঁকি নেওয়া হয়? প্রতিষ্ঠিত নামের নিরাপদ বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে আসার সাহস কতটা আছে?

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের আরেকটি প্রবল সমস্যা হলো নকল করার প্রবণতা। বিদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ অবশ্যই প্রয়োজন। কোনো সংস্কৃতি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচতে পারে না। কিন্তু গ্রহণ আর অনুকরণ এক জিনিস নয়। অন্যের পোশাক, গান, স্থাপত্য, জীবনযাপন কিংবা বিনোদনের ধরন গ্রহণ করা সহজ; অন্যের চিন্তার স্বাধীনতা, গবেষণার অভ্যাস, শৃঙ্খলা, সৃজনশীল সাহস এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সংস্কৃতি গ্রহণ করা কঠিন। আমরা প্রায়ই সহজ অংশটি গ্রহণ করি, কঠিন অংশটি এড়িয়ে যাই।

বাংলা সংস্কৃতির আকাল গ্রামেও আছে, শহরেও আছে। তবে তার রূপ ভিন্ন। শহরে সংস্কৃতি অনেক সময় পণ্য হয়ে ওঠে, গ্রামে সংস্কৃতি অনেক সময় অবকাঠামোর অভাবে সংকুচিত হয়। গ্রামীণ যাত্রা, পালাগান, কবিগান, বাউল, ভাটিয়ালি, লোককথা, কারুশিল্প—এসব শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এগুলো মানুষের দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। অথচ লোকসংস্কৃতিকে আমরা জীবন্ত স্রোত হিসেবে না দেখে পর্যটনের প্রদর্শনীতে পরিণত করার প্রবণতা দেখাই। লোকশিল্পীর জীবনের বাস্তবতা না বদলে তার গানকে মঞ্চে তুলে নিজেদের সাংস্কৃতিক দায় শেষ করি।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, আমরা সংস্কৃতির নামে বিভাজন তৈরি করছি। সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে সেতু তৈরি করার কথা; অথচ আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসরে কখনো কখনো মত, পরিচয়, শ্রেণি ও রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী মানুষকে আলাদা করে দেখা হয়। যে সংস্কৃতি প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে সংস্কৃতি যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, তার ভিত দুর্বল। যে সংস্কৃতি নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, সে সংস্কৃতি আসলে নিজের আয়না ভেঙে ফেলেছে।

বাংলা সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ তাই আরও বেশি অনুষ্ঠান দিয়ে হবে না। হবে পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে এনে, গ্রন্থাগারকে জীবন্ত করে, বিদ্যালয়ে মুখস্থবিদ্যার পাশাপাশি সাহিত্য ও শিল্পের জায়গা বাড়িয়ে, স্থানীয় সংস্কৃতির ধারকদের মর্যাদা দিয়ে, নতুন শিল্পীদের ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ দিয়ে। হবে বাংলা ভাষাকে কেবল আবেগের বিষয় না বানিয়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও আধুনিক চিন্তার শক্তিশালী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে একজন তরুণ কবি প্রতিষ্ঠিত কবির বিরুদ্ধে কবিতা লিখতে পারে, একজন গবেষক প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারে, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা অস্বস্তিকর বাস্তবতা দেখাতে পারে, একজন পাঠক প্রিয় লেখকের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলতে পারে এবং একজন শিল্পী নিজের ব্যর্থতা থেকে নতুন শিল্পভাষা আবিষ্কার করতে পারে। সংস্কৃতির প্রাণ সেখানেই—স্বাধীন চিন্তায়, সৃজনশীল অসন্তোষে এবং প্রশ্ন করার সাহসে।

বাংলা সংস্কৃতি মৃত নয়। তার শিকড় এখনও গভীরে। নদীর পাড়ের গান, মফস্বলের নাট্যমঞ্চ, অখ্যাত কবির খাতা, কোনো গ্রামের পাঠাগারের পুরোনো আলমারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্জন কক্ষে বসে লেখা গবেষণাপত্র, তরুণের হাতে ধরা নতুন কবিতার বই—সবখানেই তার জীবন ছড়িয়ে আছে। আকাল আছে মূলত আমাদের দৃষ্টির, আমাদের পৃষ্ঠপোষকতার, আমাদের মনোযোগের এবং সবচেয়ে বেশি—আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মসমালোচনার।

আমরা যদি সংস্কৃতিকে শুধু উদ্‌যাপন করতে থাকি, কিন্তু তাকে প্রশ্ন না করি, তাহলে একদিন আমাদের হাতে থাকবে সংস্কৃতির বিপুল স্মারক—কিন্তু সংস্কৃতি থাকবে না।

সংস্কৃতি আসলে কোনো মঞ্চের অনুষ্ঠান নয়।
সংস্কৃতি হলো মানুষ কীভাবে মানুষ হয়ে ওঠে—তার দীর্ঘ, কঠিন এবং অসমাপ্ত সাধনা।

সেই সাধনাতেই আজ আমাদের ফিরে যেতে হবে।


লেখক: কলামিস্ট
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এমকে
  বিষয়:   সংস্কৃতি  উৎসব  সংস্কৃতি 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: