শিশু নিখোঁজের পর শুরুর ঘণ্টাগুলো কোথায় হারায়

হাবিবুর রহমান সাগর

মতামত

ঘড়ির কাঁটা দিয়ে একটি শিশুর মৃত্যুর হিসাব করা যায় না, তবু এই লেখা শুরু করতে হচ্ছে ঘড়ি দিয়েই। কারণ এই

2026-09-23T04:30:52+00:00
2026-09-23T04:30:52+00:00
 
  বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
শিশু নিখোঁজের পর শুরুর ঘণ্টাগুলো কোথায় হারায়
হাবিবুর রহমান সাগর
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৩০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ঘড়ির কাঁটা দিয়ে একটি শিশুর মৃত্যুর হিসাব করা যায় না, তবু এই লেখা শুরু করতে হচ্ছে ঘড়ি দিয়েই। কারণ এই মৃত্যুর প্রতিটি মুহূর্তে একটি করে সুযোগ ছিল।

শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ীর ভাড়া বাসা থেকে বেরিয়েছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শালবন বিহারে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে সে বের হয়েছিল, আর ফেরেনি। সন্ধ্যার পর তার বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করে দেখা যায়, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ফোনটি গন্ধমতি এলাকায় ছিল। তারপর তা বন্ধ হয়ে যায়। 

পরদিন শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়, মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন নিয়ে।ফোনের শেষ সংকেত থেকে মরদেহ উদ্ধার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৮ ঘণ্টা, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে হিসাব করলে প্রায় ২২ ঘণ্টা। এই সময়টায় একটি মা ফেসবুকে ছেলের ছবি দিয়ে সাহায্য চেয়েছেন, একটি বাবা থানায় গেছেন, আর একটি দেশ ঘুমিয়েছে। আমরা এই লেখায় ২২ ঘণ্টার সেই ফাঁকটাই খুঁজব। অপ্রতিম একা নয়, এমন আরও বহু ফাঁক আছে। 

প্রতি ঘণ্টায় তিনটি নিখোঁজ 

শিশু অপ্রতিমের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, সংখ্যাগুলো তা বলে না। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। ৭ মাসে দিন হয় ২১২টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৪ জন, প্রতি ঘণ্টায় ৩টিরও বেশি শিশু। এই লেখা পড়তে আপনার যে কয়েক মিনিট লাগল, তার মধ্যেই কোথাও একটি পরিবার ‘আমাদের সন্তান কোথায়’ প্রশ্নটি প্রথমবারের মতো উচ্চারণ করেছে।

পুলিশের দাবি, ৮৭ শতাংশের বেশি শিশুকে উদ্ধার করা গেছে। উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন। এটি সত্যিই সাফল্য। কিন্তু বাকি ২ হাজার ৩৮ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৩ শতাংশ, এখনও ফেরেনি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি শিশু ‘নিখোঁজ’ শব্দটির ভেতর থেকে আর বের হচ্ছে না। আর যারা ফিরেছে, তাদের সবাই যে অক্ষত ফিরেছে, এমন নয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে অন্তত ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে আসকের নথিতে নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছে ৬৮ জন। পরিবারের ভেতরে নির্যাতনে নিহত ৪৯ জন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ২৬ জন। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪টি। গুলিতে মৃত্যু ৩টি। গৃহকর্মী শিশুর ওপর নির্যাতনে মৃত্যু ২টি। এই তালিকায় কোনো ‘অন্যান্য’ শিরোনাম নেই, প্রতিটি সারি একেকটি ভিন্ন ধরনের বিপদের নাম।

ভয়ের ঠিকানা ভুল জায়গায়

আমরা শিশুদের শিখাই, ‘অচেনা মানুষের কাছ থেকে চকলেট নিয়ো না’। উপদেশটা ভালো, কিন্তু পরিসংখ্যানের পাশে রাখলে অসম্পূর্ণ। আসকের তালিকার ১৫৫ জনের মধ্যে ৪৯ জন প্রাণ হারিয়েছে নিজের পরিবারের ভেতরে। এই সপ্তাহেই জামালপুরের মাদারগঞ্জে ৭ বছরের এক শিশুর কথা আমরা জেনেছি। সে স্কুলে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। পুলিশের ভাষ্য, সহপাঠীর বাবা তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। পাবনায় ১০ বছরের একটি শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়ে ৭ দিন পর ডোবা থেকে মরদেহ হয়ে ফিরেছে।


অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও ঘাতকরা ছিল পরিচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জড়িতদের সঙ্গে অপ্রতিমের ওঠাবসা ও বন্ধুত্ব ছিল, তাদের বয়স তার চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বেশি। শিশুটি এই সম্পর্ককে ‘বন্ধুত্ব’ ভেবেছিল, বড় ভাইদের সঙ্গে থাকাকে হয়তো নিজের বড় হয়ে ওঠার প্রমাণও ভেবেছিল। ১৩ বছরের একজনের চোখে ১৭-২২ বছরের কারাও সঙ্গে সখ্য গর্বের বিষয় হতে পারে। প্রতিবেদনগুলোতে এই সম্পর্কের সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকার একটি পাওনার প্রসঙ্গও এসেছে। তদন্ত শেষ হয়নি, তাই এর বেশি বলার সুযোগ নেই। তবে যে সম্পর্কে বয়সের এই ফাঁক আছে, সেখানে ক্ষমতার ফাঁকও থাকে।

এখান থেকে একটি অস্বস্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। আমাদের শিশু-নিরাপত্তার ভাষা এখনও ‘বাইরের শত্রু’র ছবিতে আটকে আছে। বাস্তবের বিপদ বেশিরভাগ সময় আসে বিশ্বাসের দরজা দিয়ে। পাশের বাসার ভাইয়া, সহপাঠীর বাবা, খেলার সঙ্গী, বড় বন্ধু। শিশুকে আমরা ‘অচেনা’ থেকে সাবধান করি, কিন্তু ‘চেনা’র মধ্যে কোন আচরণটা বিপজ্জনক, তা কখনো শেখাই না।

একটি ফোনের দাম

ঘটনার পেছনে পুলিশ যে উদ্দেশ্য দেখছে, তা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ফোনটি উদ্ধার হয়েছে। আদালতে তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে খবর এসেছে, মোট গ্রেফতার চারজন।

এখানে একটি অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রশ্ন আছে, যা আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। একটি স্মার্টফোন এখন কেবল যন্ত্র নয়, মর্যাদার প্রতীক। যে সমাজে কয়েক হাজার টাকার ঋণ কিংবা ফোন একটি প্রাণের চেয়ে বেশি লোভনীয় হয়ে ওঠে, সেখানে ফোনটি হাতে নিয়ে হাঁটা শিশু আসলে ‘চলমান টোপ’। মা-বাবার দামি ফোন সন্তানের হাতে দেওয়া আধুনিক অভিভাবকত্বের অংশ। কিন্তু এর সঙ্গে যে ঝুঁকিও আসে, সে হিসাব আমরা করি না। ফোনে লোকেশন শেয়ারিং চালু

থাকলে, কিংবা অন্তত পরিবারের নিজস্ব একটি নিয়ম থাকলে (‘কোথায় যাচ্ছ, কার সঙ্গে, কখন ফিরবে’), সেই সন্ধ্যার ছবিটা ভিন্ন হতে পারত। এটি অভিভাবকের দোষ খোঁজা নয়। শোকার্ত একটি পরিবারের দিকে আঙুল তোলা আমাদের কাজ নয়। বরং প্রশ্নটা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে— সাধারণ পরিবারকে এই প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয়ে কে শেখাচ্ছে?

‘কিশোর গ্যাং’ লেবেলের সীমাবদ্ধতা

ঘটনার পর কিশোর অপরাধ নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে। সেই আলোচনার পেছনে বাস্তব ভিত্তিও আছে। আজকের পত্রিকার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, সারা দেশে ২৩৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়, সদস্য প্রায় ৫০ হাজার। মোহাম্মদপুর, বসিলা ও আদাবর— এই তিন এলাকা থেকেই গত দেড় বছরে অন্তত চার হাজার কিশোর অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে। অথচ পুলিশের ভাষ্য, কয়েক মাসের মধ্যেই তারা জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে ফেরে। চার হাজার গ্রেফতারের পরও কিশোর গ্যাং কমছে না। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই। 

ঘাতকরা কোনো পরিচিত গ্যাংয়ের সদস্য ছিল কি না, তা এখনও তদন্তাধীন। যদি না হয়, তা হলে নিরাপত্তাব্যবস্থার জাল খুব সংকীর্ণ জায়গায় ফেলা হচ্ছে। আমরা ‘গ্যাং’ খুঁজছি, অথচ বিপদ আসছে এমন তরুণদের কাছ থেকে যাদের নাম কোনো তালিকায় নেই। যাদের কেউ চিনত ‘ভালো ছেলে’ বা ‘ওই বাসার ভাইয়া’ বলে।

দুই ধরনের গতি

অপ্রতিম হত্যার ক্ষেত্রে পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের তৎপরতা প্রশংসাযোগ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, জড়িত সবাইকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার তদন্তও দ্রুত এগিয়েছে, আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে এই গতি প্রত্যাশিত।

তবু এই গতি ‘দ্বিতীয় গতি’, অর্থাৎ ঘটনার পরের গতি। যে গতি একটি শিশুকে বাঁচাতে পারত, সেই প্রথম গতি, অর্থাৎ ঘটনা ঘটার আগে বা ঘটার সময়ের গতি, আমাদের ব্যবস্থায় এখনও অনুপস্থিত। সন্ধ্যায় জিডি হয়েছে, ফোনের অবস্থান জানা গেছে, তারপর রাত গড়িয়েছে। পরদিন দুপুরে খোঁজ মিলেছে জঙ্গলে। এই ফাঁকটাই আসল ব্যর্থতা, এখানে কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে না। দায় ব্যবস্থার।

আমরা জানি, অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনায় প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদর দফতরের ‘ফ্রি হেল্পলাইন’ (১৩২১৯) এ বছরের ১৩ জানুয়ারি চালু হয়েছে। অপ্রতিমের ঘটনায় প্রথমবারের মতো জরুরি ‘মুন অ্যালার্ট’ চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এই ব্যবস্থা কেন এত দেরিতে, বছরে ১৫ হাজারের বেশি নিখোঁজের পর, প্রথমবারের মতো কাজে লাগল? প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর জন্য কি এটি সক্রিয় হয়? এবং কেন আজও অনেক থানায় অভিভাবকদের শুনতে হয় ‘অপেক্ষা করুন, ফিরে আসবে’? যে সমাজে একজন মাকে সন্তান খুঁজে পেতে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিতে হয়, সেখানে রাষ্ট্রীয় নিখোঁজ তালিকার ভূমিকা কোথায়?

যে ফোনটি ফিরে এলো

এই লেখার শুরুতে ঘড়ির কথা বলেছিলাম। শেষ করি একটি বস্তু দিয়ে। পুলিশ আইফোনটি উদ্ধার করেছে। ফোনটির স্ক্রিনে হয়তো এখনও সেই ছবিগুলো আছে, যা একটি ১৩ বছরের ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে তুলতে চেয়েছিল। যে শিশুটি সেই ফোন হাতে বেরিয়েছিল, সে ফেরেনি।

শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   শিশু নিখোঁজ  অপ্রতিম  মতামত 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: