মাদককে আমরা অনেক সময় একজন ব্যক্তির সমস্যা হিসেবে দেখি। বলি— ‘সে মাদক নেয়, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ কিন্তু মাদক কখনোই শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপার হয়ে থাকে না। একজন মানুষ যখন মাদকের কবলে পড়ে, তার সঙ্গে তার পরিবার, কর্মক্ষেত্র, বন্ধুমহল এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদক একজন মানুষকে দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু তার ধ্বংসের পরিধি একটি সমাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে নতুনভাবে দেখতে হবে। শুধু মাদক উদ্ধার, গ্রেফতার বা শাস্তির মধ্যে এই লড়াই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। মাদকের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে, তরুণদের সামনে ইতিবাচক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে এবং যারা ইতিমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমরা কি শুধু সমস্যার দৃশ্যমান অংশটিই দেখছি? মাদকাসক্ত একজন মানুষকে দেখে আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি—‘সে কেন মাদক নিল?’ কিন্তু আরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার। সে কী পরিস্থিতির মধ্যে বড় হয়েছে? তার পরিবারে কী ঘটছিল? তার কি কোনো মানসিক বা সামাজিক সংকট ছিল? সে কি বেকার ছিল? সে কি কোনো গোষ্ঠীর চাপের মধ্যে ছিল? তার কি জীবনে কোনো লক্ষ্য বা আশার জায়গা ছিল?
একজন তরুণকে যদি মাদক থেকে দূরে রাখতে হয়, তা হলে তাকে এমন একটি ভবিষ্যৎ দিতে হবে যার দিকে সে এগিয়ে যেতে চাইবে। তাকে শিক্ষা দিতে হবে। দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, তাকে বোঝাতে হবে— তার জীবন মূল্যবান এবং ভবিষ্যতের জন্য সমাজ তার প্রয়োজন।
প্রতিরোধ শুরু হোক পরিবার থেকেই। মাদক প্রতিরোধের প্রথম প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত পরিবার। সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক যদি কেবল শাসন ও ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা হলে সন্তান অনেক সময় নিজের সমস্যাগুলো গোপন করতে শেখে। কিন্তু পরিবার যদি এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে যেখানে সন্তান নিজের ভুল, ভয়, বন্ধুত্ব, মানসিক চাপ ও সমস্যার কথা বলতে পারে, তা হলে বিপদ অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। অভিভাবকদেরও মাদক সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তাকে অপমান বা হুমকি দেওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মাদকবিরোধী শিক্ষা আরও বাস্তবভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। শুধু ‘মাদক খারাপ’— এই বার্তা যথেষ্ট নয়। তরুণদের জানতে হবে মাদক কীভাবে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সম্পর্ক, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। তরুণদের সামনে স্বপ্ন তৈরি করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধের একটি হলো— সুযোগ। যে তরুণের হাতে বই আছে, খেলাধুলার মাঠ আছে, শেখার সুযোগ আছে, একটি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ আছে এবং ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার আশা আছে— তার সামনে ইতিবাচক পথ তৈরি হয়।
তাই মাদক প্রতিরোধের বাজেটকে শুধু অভিযান বা আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। যুব উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ করতে হবে। একটি মাঠ তৈরি করা হয়তো সরাসরি মাদক নির্মূল করে না। একটি লাইব্রেরি হয়তো কোনো মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে না। একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র হয়তো মাদক উদ্ধার করে না। কিন্তু এগুলো একজন তরুণের জীবনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। আর একজন তরুণকে বাঁচানো মানে শুধু একজন মানুষকে বাঁচানো নয়— একটি পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানো।
পুনর্বাসনকেন্দ্র আরও বেশি দরকার। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো পুনর্বাসনের সুযোগের সীমাবদ্ধতা। একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন শুধু তাকে মাদক থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। অনেকের জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা, পরিবারভিত্তিক সহযোগিতা এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ।
তাই আরও বেশি মানসম্মত ও সহজলভ্য পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তবে পুনর্বাসনকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। সেসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত পেশাজীবী, উপযুক্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা থাকতে হবে। কারণ মাদকাসক্ত একজন মানুষকে কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা দিয়ে আবার আগের পরিবেশে ফিরিয়ে দিলে সমস্যার মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। পুনর্বাসনের পর কী হবে? এখানেই আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। চিকিৎসা শেষ করার পর একজন মানুষ কোথায় যাবে? সে কি কাজ পাবে? পরিবার কি তাকে গ্রহণ করবে? সমাজ কি তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেবে? সে কি কাউন্সেলিং বা সহায়তা অব্যাহত রাখতে পারবে?
যদি উত্তরগুলো নেতিবাচক হয়, তা হলে পুনরায় মাদকের দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই পুনর্বাসনের অর্থ শুধু একটি কেন্দ্রে চিকিৎসা শেষ করা নয়। পুনর্বাসনের অর্থ হলো— একজন মানুষকে সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করা। কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, পরিবারে পুনঃএকীভূত হওয়া, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা— এসবকে পুনর্বাসন ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। একজন মানুষকে মাদক থেকে বের করে এনে বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের মধ্যে ফেলে রাখা প্রকৃত পুনর্বাসন নয়।
মাদকাসক্ত মানুষকে কি আমরা শুধু অপরাধী হিসেবে দেখব? আইন ভঙের ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। মাদক কারবার ও পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগও অপরিহার্য। কিন্তু মাদকাসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমাজকে একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন করতে হবে— এই মানুষটিকে কীভাবে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়? সহানুভূতি মানে অপরাধকে বৈধতা দেওয়া নয়। পুনর্বাসন মানে জবাবদিহিতা বাতিল করা নয়। বরং একজন মানুষকে তার ভুলের পর সংশোধনের সুযোগ দেওয়া একটি সুস্থ সমাজের বৈশিষ্ট্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তির পেছনে একজন মা-বাবা থাকতে পারেন, একজন জীবনসঙ্গী থাকতে পারেন, সন্তান থাকতে পারে। তার নিজেরও হয়তো একসময় স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে— এমন সিদ্ধান্ত খুব তাড়াতাড়ি নেওয়া উচিত নয়।
মাদক কারবারের শিকড়েও আঘাত করতে হবে। মাদক সমস্যার আরেকটি দিক হলো অবৈধ মাদক ব্যবসা। যারা মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে মাদক বিক্রি করে লাভবান হয়, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। সরবরাহের উৎস, পাচার নেটওয়ার্ক এবং অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে মাদকের চাহিদা কমাতেও কাজ করতে হবে। কারণ একটি বাজারে শুধু সরবরাহ বন্ধ করার চেষ্টা করলে, কিন্তু চাহিদার কারণগুলো অক্ষত রাখলে সমস্যাটি অন্য রূপে ফিরে আসতে পারে।
একটি মানুষকে বাঁচানো মানে একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আমরা যদি শুধু দেখি কে মাদক নিচ্ছে, তা হলে সমস্যার একটি অংশই দেখব। আমাদের দেখতে হবে— কেন সে মাদক নিচ্ছে, কীভাবে তাকে চিকিৎসা দেওয়া যায়, কীভাবে তার পরিবারকে সহায়তা করা যায়, কীভাবে তাকে পুনরায় সমাজে ফিরিয়ে আনা যায় এবং কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে একই পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যায়।
কারণ মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না। তার ধাক্কা লাগে একটি পরিবারে। পরিবার থেকে সেই সংকট ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে সমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। আমরা যদি আজ একজন তরুণকে মাদকের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি, তা হলে শুধু একটি জীবন নয়— একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং একটি সম্ভাবনাকে রক্ষা করতে পারব। তাই এখন সময় শুধু প্রশ্ন করার নয়— কাজ করার।
আরও কার্যকর প্রতিরোধ চাই। আরও বেশি পুনর্বাসনকেন্দ্র চাই। চাই মানসম্মত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং। চাই তরুণদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। চাই মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ। আর চাই এমন একটি সমাজ, যেখানে ভুল করা মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে।
মাদকমুক্ত সমাজ শুধু পুলিশের হাতে তৈরি হবে না। এটি তৈরি হবে পরিবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আইন এবং মানবিকতার সম্মিলিত শক্তিতে। আজ যদি আমরা মাদকের শিকড়ে আঘাত করতে পারি, তা হলে আগামী প্রজন্মকে একটি নিরাপদ সমাজ দিতে পারব। কারণ শেষ পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় বিজয় হবে কোনো একটি মাদক চালান আটকানো নয়— একজন মানুষকে তার জীবন ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
আইনজীবী, সিনিয়র কোর্টস অব ইংল্যান্ড
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে