রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ ভূমিতে ফিরতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটে নিরাপদ প্রত্যাবাসনই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থানীয় পরিবেশের প্রশ্নও রয়েছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যা এখন নিছক মানবিক সংকট নয়। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। ২০১৭ সালের পর দফায় দফায় বড় আকারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসে। গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আশ্রয় শিবিরগুলোতে জন্ম নিয়েছে অনেক রোহিঙ্গা শিশু। মিয়ানমারের নাগরিক হয়েও তারা নিজেদের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন। এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হবে, প্রত্যাবাসন তত কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাও কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালে সেই আবেদন কমে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অথচ সহায়তার প্রয়োজন কমেনি। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের সহায়তার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবা চালু রাখতে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা জরুরি। তবে শুধু সহায়তা দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। সহায়তা মানুষের জীবন রক্ষা করবে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করবে না।
সমস্যা হচ্ছে, রাখাইনে এখনও সংঘাত চলছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের আটক করা, চলাচলে বাধা দেওয়া ও জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার মতো নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা জাতিসংঘের বৈঠকে উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন শুরু করা হলে তা নিরাপদ ও টেকসই হবে কি না সেই প্রশ্ন রয়েছে। তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ জরুরি।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই সংকট সীমানা পেরিয়ে আঞ্চলিক ঝুঁকি তৈরি করছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে মানব পাচার, মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন ও সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বাড়ছে। যে কারণে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার রয়েছে। তারা প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে।
রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথনকশা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল নিতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল ধরে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে মিয়ানমারে। তাই এর টেকসই সমাধানের মূল দায়িত্বও মিয়ানমারকেই নিতে হবে। আর এই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাজ করা উচিত।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা