জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে দেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলায় দেওয়া ভাষণে তিনি গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্র পুনর্গঠন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, ফিলিস্তিন ইস্যু, অভিবাসন, শান্তি রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা বলেছেন। জাতিসংঘের মতো বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। সেই কাজটা তিনি যথাযথভাবে করতে পেরেছেন। আগামী দিনে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলে এই ভাষণ অর্থবহ ফল বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র ও নাগরিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন যে, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। বক্তব্যে তিনি রাষ্ট্রের শক্তিকে নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজন বা নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করার অধিকারও নিশ্চিত করা জরুরি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি আন্তর্জাতিক স্বার্থের জায়গা হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট। বহু বছর ধরে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে চাপ বহন করছে সেটা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বিষয় হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠকও হয়েছে। এখন এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কে কী ভূমিকা নেবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুতেও বাংলাদেশের বক্তব্য যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের দায় কম। অথচ কার্বন নিঃসরণের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির বড় বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশকে আগামীতে বড় মূল্য দিতে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার দাবি যৌক্তিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পাশাপাশি ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি ও মানবিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত বাড়ার সময়ে শান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ধারার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অভিবাসন ও শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের অবদানও ভাষণে গুরুত্ব পেয়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান এবং নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সুশাসন, জবাবদিহি ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির বার্তা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের রাজনৈতিক মঞ্চের বাইরে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাও এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ।
প্রশ্ন হচ্ছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই ভাষণের পর বাংলাদেশ কতটা অগ্রসর হতে পারবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বমঞ্চে শুধু বক্তব্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত বদলানো কঠিন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নে বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চাইলে ধারাবাহিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।
ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সেটা ঠিক আছে। এখন সেই সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট রূপ নিশ্চিত করতে হবে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে কি না। জলবায়ু অর্থায়নের অগ্রগতি কতটা হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
দেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কতটা বৃদ্ধি পায় সেটা দেখতে হবে। পাশাপাশি গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এলো কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বর তাই শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব অর্জনেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে