দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা কৃষি খাত এক অস্বাভাবিক চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে সারসংকট, অন্যদিকে সদ্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। দফায় দফায় কৃষি উপকরণের ব্যয় বাড়তে থাকায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ফসল ফলিয়েও লাভের মুখ দেখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি আরও ২০ টাকা বাড়িয়েছে।
চলতি বছরেই এটি তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও অকটেনে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এরপর ১ জুন থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়।
এভাবে দফায় দফায় জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ডিজেলের দাম প্রায় ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়ে গেছে। ডিজেল এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে দেশের কৃষি উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থা সরাসরি জড়িত। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সেচ, ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ, ফসল মাড়াই এবং পরিবহন— প্রতিটি ধাপেই ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশই ডিজেল। পরিবহনের পর সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যবহার হয় কৃষি খাতে। ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বাড়ায় কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ফলে খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষির অন্যতম প্রধান চাহিদা সেচ। বিশেষ করে ধান চাষে সেচ অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থা এখনও মূলত ডিজেলনির্ভর। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকাজে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৪ শতাংশ। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষের জন্য প্রায় ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।
অর্থাৎ প্রতি লিটারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি প্রতিটি বিঘার খরচে যুক্ত হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ডিজেলের দাম বাড়ার পর বিঘাপ্রতি কৃষকের অতিরিক্ত খরচ কয়েকশ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে এই বাড়তি বোঝা কয়েকশ থেকে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে মূল্যবৃদ্ধির পরই কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছিলেন, ডিজেলের বাড়তি খরচ মিলিয়ে কৃষকের সামগ্রিক ব্যয় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে যেতে পারে।
শুধু সেচ নয়, জমি চাষ, ফসল কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরতার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক ও কৃষিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সেখানে কৃষি উৎপাদন ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্রও স্পষ্ট। শ্যালো মেশিন পরিচালনাকারী কৃষকরা জানান, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টাপ্রতি সেচের ভাড়াও বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ আগের দামে সেচ দিলে তাদের পোষাবে না। একই সঙ্গে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের প্রকৃত মুনাফা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এক কৃষক জানিয়েছেন, সেচের পানি, সার, বীজ, কীটনাশক ও ধান কাটার খরচ মিলিয়ে এ মৌসুমে তার ব্যয় এমনিতেই প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
কৃষকের এই দুশ্চিন্তা ও মুনাফার সংকোচন দেশের কৃষি খাতকে নতুন সংকটে ফেলতে পারে। যেসব কৃষক বর্গাচাষি বা প্রান্তিক পর্যায়ের, তাদের জন্য এই বাড়তি খরচ বহন করা আরও কঠিন। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধানও ক্রমশ বাড়ছে, যা কৃষি খাতে বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা খাদ্যপণ্যের বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্য আনার খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন ও সেচের খরচ বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষকের লোকসান এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি— দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর প্রভাব থেকে কৃষিকে রক্ষা করার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই। অন্যথায় দফায় দফায় এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত সেচে ভর্তুকির সম্প্রসারণ, কৃষিসেচে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য পৃথক ভর্তুকিমূল্য বা কার্ডভিত্তিক বরাদ্দব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে বাজারদর বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি কৃষকের ওপর না পড়ে। দ্বিতীয়ত সৌরচালিত সেচপাম্প ও বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রণোদনা বাড়িয়ে ডিজেলনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে।
তৃতীয়ত উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ক্রয়মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে কৃষকরা ন্যায্য দাম পান। চতুর্থত পরিবহন ব্যয়ের অজুহাতে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। এ ছাড়া প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ফসলবিমার আওতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তারা বাড়তি খরচের ধাক্কা সামলাতে পারেন।
লেখক : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও