পানিবণ্টন চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি, সুস্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ, তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। আন্তর্জাতিক পানি আইন ও সংশ্লিষ্ট চুক্তির আলোকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় দক্ষ আইনজীবী, পানি বিশেষজ্ঞ, নদী গবেষক ও কূটনীতিকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও পলিগঠিত এক অনন্য বদ্বীপ। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ওপর আমাদের অধিকার ও স্বার্থ দেশের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি গভীরভাবে জড়িত। প্রতি বছর বিশ্ব নদী দিবস ফিরে আসে নদীর গুরুত্ব ও নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিতে। ২০২৬ সালের বিশ্ব নদী দিবস ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্যে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে নদী ও জলপথের সম্পর্ক এবং এগুলো রক্ষার গুরুত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদী রক্ষার এই বৈশ্বিক আহ্বান বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি ভারতের সঙ্গে এবং তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে অভিন্ন। এসব নদী বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আন্তর্জাতিক নদীগুলোর মধ্যে তিস্তা আজ চরম সংকটে। উজানে পানি প্রত্যাহার ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বিস্তীর্ণ অংশে পানির সংকট দেখা দেয়। তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন-জীবিকা এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষিজমিতে সেচের সংকট তৈরি হয়, মৎস্যসম্পদ কমে যায় এবং নদীনির্ভর মানুষের কর্মসংস্থানও ব্যাহত হয়। তিস্তার প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও পড়ছে।
তিস্তার চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের দুঃখ-কষ্টেরও শেষ নেই। বর্ষায় নদীভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীন হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে হাহাকার দেখা দেয়। নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ সরকারের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটির আওতায় প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত গঙ্গার পানি বণ্টন করা হয়।
গঙ্গার প্রবাহ কমে গেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর বহুমুখী প্রভাব পড়ে। নদীর নাব্যতা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, লবণাক্ততা এবং সুন্দরবনের পরিবেশ— সবকিছুর ওপর এর প্রভাব রয়েছে। তাই গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সময়োপযোগী, ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান জরুরি।
মুহুরী, ফেনী ও সাঙ্গু নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। এসব নদীর পানি ও নাব্যতার ওপর স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগব্যবস্থা নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে চাষাবাদ ব্যাহত হয়। নদীর নাব্যতা কমে গেলে নৌ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। একইভাবে মাতামুহুরী, নাফসহ সীমান্তবর্তী আরও কয়েকটি নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
করতোয়া, আত্রাই ও পুনর্ভবা নদীর অববাহিকাতেও নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব দৃশ্যমান। কোথাও কোথাও শুষ্ক মৌসুমে নদীর বড় অংশে পানি কমে যায়। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীর ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবীদের অনেকেই জীবিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইছামতি, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। ধরলা নদীর অববাহিকায় বর্ষায় ভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট— দুই ধরনের সমস্যাই দেখা যায়। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর প্রবাহ, নাব্যতা ও ভাঙন নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কালজানি, রায়ডাক, গদাধর, জলঢাকা, সোমেশ্বরী ও যদুকাটা নদীর ক্ষেত্রেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এসব নদীর সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতি জড়িত। নদীর তলদেশে পলি জমা, অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন, দূষণ এবং উজানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নদীর স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ধলা, পিয়াইন ও সারিগোয়াইনসহ সিলেট অঞ্চলের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ওপরও নানা ধরনের চাপ রয়েছে। পাথর উত্তোলন, নাব্যতা হ্রাস, পাড় ভাঙন ও পানির প্রবাহের পরিবর্তন এসব নদীর পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। নদীগুলোর তীরবর্তী মানুষের জীবিকা রক্ষায় নদী ও প্রতিবেশব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ও নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শুধু একক কোনো দেশের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং নিয়মিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের মতো বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোকে আরও কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি নেপাল, ভুটানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে পানি ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় ফোরামেও আন্তঃসীমান্ত পানির ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরা দরকার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের আন্তঃসীমান্ত পানি কনভেনশনে যোগ দিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে অভিন্ন নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতা আরও জোরদার করা যেতে পারে। ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। প্রতিটি নদীর প্রবাহ, পানি প্রত্যাহার, নাব্যতা, পলি জমা, ভাঙন, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের ওপর প্রভাব নিয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া দরকার। এসব তথ্য-উপাত্ত আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন চুক্তি বা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, ন্যায্য হিস্যা, পরিবেশগত প্রয়োজন এবং নিম্ন অববাহিকার মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, তখনও চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি।
আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যেতে পারে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পানি ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বন্যা ব্যবস্থাপনা, শুষ্ক মৌসুমের পানি প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, নৌ-পথ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ— এসব ক্ষেত্রেও যৌথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
নদী রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। পরিবেশবাদী সংগঠন, নদী গবেষক, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষক, জেলে ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নদী রক্ষার পরিকল্পনা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
পানিবণ্টন চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি, সুস্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ, তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। আন্তর্জাতিক পানি আইন ও সংশ্লিষ্ট চুক্তির আলোকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় দক্ষ আইনজীবী, পানি বিশেষজ্ঞ, নদী গবেষক ও কূটনীতিকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। তিস্তাপারের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় ন্যায্য ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। তিস্তা সমস্যার সমাধানে শুধু পানিবণ্টন নয়, নদী ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নদী আমাদের জীবন ও প্রকৃতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ন্যায্য ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত নদী রক্ষা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
সম্মিলিত প্রচেষ্টা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দূরদর্শী কূটনীতি বাংলাদেশের নদীগুলোর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নদীগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাক, প্রকৃতিও ফিরে পাক তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে