বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে, ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ কী? ছাপা পত্রিকা কি আদৌ টিকে থাকবে? অনেকেই বলছে, ছাপা পত্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনাও নেই। আসলেই কি তাই? এ বিষয়ে পর্যালোচনার আগে ভয়ংকর ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রথম ভয়ংকর ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্ত হয়। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাস বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কারোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে। পৃথিবীর এমন কোনো ভূখণ্ড ছিল না যেখানে করোনার আঁচড় লাগেনি।
গত শতাব্দীতে মধ্য এশিয়া থেকে প্লেগ বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় প্লেগে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায়। যদিও প্লেগ মহামারি প্রথম শুরু হয় ৫৪১ সালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময়। তখন প্লেগে বিশ্বের প্রায় ৫ কোটি লোক মারা যায়। দ্বিতীয়বার প্লেগ আঘাত হানে ১৩৪৭ সালে ইউরোপে। পরে তা মহামারি আকারে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রাণ হারায় প্রাণ ৭ কোটি মানুষ। প্লেগের চেয়ে ভয়ংকর ছিল কোভিড-১৯। কোভিডে আক্রান্ত হয়ে লোক মারা যাওয়ার সংখ্যা প্লেগের চেয়ে কম হলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, করোনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ মানুষ মারা গেছে। বাংলাদেশে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হলেও ক্ষতির শিকার অধিকাংশ মানুষ। অসংখ্য শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারন করে। পরিসংখ্যান বলছে, টানা লকডাউনের কারণে ১৩ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় দুই বছর কার্যত বন্ধ থাকায় চার কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের স্থলে ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্প। ছাপা পত্রিকার ওপর এত বড় আঘাত আগে কখনো আসেনি। পত্রিকাগুলোর সর্বাঙ্গে এখনও করোনার ক্ষত। জানি না কীভাবে এই ক্ষত সারবে।
করোনাকালীন মানুষ বাসায়, অফিসে পত্রিকা রাখাই বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন একটা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, পত্রিকার মাধ্যমেও করোনা ছড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দেয়। যদিও পাঠকের কাছে পত্রিকাটি আপনজনের মতো ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে পাঠক প্রথম যাকে খুঁজে ফেরেন সে হচ্ছে পত্রিকা। তাকে না পেলে অস্থির হয়ে ওঠেন। করোনা পাঠকের সেই দৈনন্দিন কার্যসূচিতে আঘাত হেনেছে। তাকে অনেক দিন পত্রিকা পড়া থেকে বিরত রেখেছে। ফলে পাঠকের দৈনন্দিন পত্রিকা পড়ার অভ্যাসে পরিবর্তন ঘটেছে।
তথ্য পাওয়ার জন্য পাঠক আগের মতো আর পত্রিকা খোঁজে না। পত্রিকার স্থান দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। যার হাতে স্মার্টফোন আছে তার হাতের মুঠোয় পুরো বিশ্ব। তথ্যের জন্য তাকে আর পত্রিকার ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না। ডিজিটাল মাধ্যম তার সব চাহিদা পূরণ করছে। বইয়ের কাছেও তাকে যেতে হয় না। সব ধরনের তথ্য সে ডিজিটাল মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে আরও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। কয়েক বছর আগেও গুগল সার্চ ইঞ্জিন ছিল মানুষের বিস্ময়কর আবিষ্কার। এমন কোনো তথ্য নেই যা গুগলে সার্চ দিলে পাওয়া যায় না। ফলে তথ্যের জন্য বই কিংবা পাঠাগারের উপযোগিতা অনেকটাই কমে গেছে। পত্রিকাগুলো যে রেফারেন্স সেকশন ছিল তাও এখন মৃতপ্রায়। গুগলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুক্ত হয়েছে এআই। মানুষ যা চাইছে তা-ই এআই করে দিচ্ছে। যেকোনো লেখা যেকোনো ভাষায় অনুবাদ, গল্প কবিতা উপন্যাস লেখা থেকে শুরু করে মনের মধ্যে যে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটছে তার সমাধান দিচ্ছে এআই। এ যেন বিস্ময়ের বিস্ময়।
সংগত কারণেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সংবাদপত্র। একদিকে করোনার ভয়াবহ আঘাত অন্যদিকে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার। এতে পত্রিকার আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় কমে যাওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। এতে শুধু যে সাংবাদিকরা বেকার হয়েছে তা নয়, পুরো সংবাদপত্র শিল্পই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। বিজ্ঞাপনদাতারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার হার দশ থেকে পনেরো শতাংশে কমিয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞাপনপদাতারা টিভি ও ডিজিটাল মাধ্যমের দিকে বেশি ঝুঁকেছে।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহার ক্রমশ বাড়তে থাকে। শিশু-কিশোর, তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ে। তারা এখন আর ছাপা পত্রিকা পড়ছে না। যুগের চাহিদা মেটাতে গিয়ে পত্রিকাগুলোও অনলাইন সংস্করণ শুরু করে। যেসব বিজ্ঞাপনদাতা ছাপা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিত, তারা ধীরে ধীরে টিভি এবং সামাজিক মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে পত্রিকার আয় ব্যাপকভাবে নেমে যায়।
ধীরে ধীরে অনেক সবল পত্রিকাও দুর্বল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। যে পত্রিকাগুলো আত্মনির্ভরশীল ছিল সেগুলোও টিকে থাকার জন্য বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আবার বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক মন্দার কারণে পত্রিকাগুলোর ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। এ কারণে ব্যয় সংকোচনীতি অবলম্বন করতে হয় কর্তৃপক্ষকে। আর ব্যয় সংকোচননীতির প্রথম শিকার হন সাংবাদিকরা।
করোনার ভয়ংকর বিস্তারে সারা দেশ যখন লকডাউন অবস্থা, তখন অনলাইন পত্রিকার হিড়িক পড়ে যায়। ঘরে ঘরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠে অনলাইন পত্রিকা। ফেসবুকসহ সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করা গুজব, ফেকনিউজ দিয়ে সাজানো হয় অনলাইনগুলো। তথ্যের যাচাই-বাছাই না করেই সংবাদ প্রকাশ করায় ‘গণমাধ্যম’ গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে পরিণত হয়। দিনে দিনে গণমাধ্যম আস্থা হারাতে থাকে। একটা সময় গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে নেমে আসে। পত্রিকার আয়ও মারাত্মকভাবে নেমে যায়। ফলে পত্রিকাগুলো সাংবাদিককর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। অনেক পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে যায়।
করোনার পুরো সময়টাই পত্রিকাগুলোর জন্য চরম একটা দুঃসময় বলা যায়। অতীতে কখনোই এত বড় দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়নি সংবাদপত্র। করোনার টিকা আবিষ্কারের ফলে ধীরে ধীরে ভাইরাসটির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কমে গেলেও তার ক্ষতচিহ্ন সর্বত্র রেখে গেছে। পত্রিকাগুলো এখনও তার শিরদাঁড়া সোজা করতে পারেনি। পাঠকসংখ্যা কমার পর নতুন পাঠক সৃষ্টি হয়নি। পুরোনো অনেক পাঠক পত্রিকা ছেড়ে ডিজিটালের দিকে ঝুঁকেছে। পত্রিকার হকারদের আয় কমে যাওয়ায় তারা অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। ফলে ছাপা পত্রিকাগুলো সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। পত্রিকার পাঠক থাকলেও অনেক সময় সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তা হলে কি ছাপা পত্রিকা হারিয়ে যাবে? বাংলাদেশের মতো বিশ্বের আর কোনো দেশে ছাপা পত্রিকা এতটা বিপদগ্রস্ত হয়নি। এখনও মানুষের আস্থার জায়গায় আছে ছাপা পত্রিকা। অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে সব খবর মানুষ পেয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেসব খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখনও মানুষের মধ্যে সংশয় আছে। এখনও সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মানুষ ছাপা পত্রিকা খোঁজে। তবে এই বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার জন্য পত্রিকাগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দিনের ঘটনা দিয়ে পত্রিকা করলে সে পত্রিকা আর পাঠক ঘরে নেবে না। পাঠককে বাড়তি কিছু দিতে হবে। প্রতিদিনের ঘটনার পেছনের ঘটনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সাহসের সঙ্গে সত্য প্রকাশ করা, রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করা, কোনো ঘটনা ধামাচাপা না দেওয়া এবং সরকারকে প্রশ্ন করার সাহস দেখাতে হবে সাংবাদিকদের।
রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে সংবাদপত্র। অপেশাদার সংবাদপত্র গণতন্ত্রের শত্রু, দেশের শত্রু। সরকারকে তোয়াজ করা মানে দেশের ক্ষতি করা। সংবাদপত্রের দায়িত্ব হচ্ছে, সরকারকে গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজটি করতে পারলে সরকারের তো বটেই, দেশেরও উপকার হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সমৃদ্ধির পথে বড় বাধা দুর্নীতি। যারাই ক্ষমতায় যায় তারাই ফুলেফেঁপে শতগুণ, হাজারগুণ বিত্তশালী হয়ে ওঠে। ভয়ে তাদের ব্যাপারে পত্রিকাগুলো কলম ধরে না। সাহসের সঙ্গে যে সংবাদপত্র এ কাজটি করতে পারবে তারা পাঠকের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।
ছাপার অক্ষরের প্রতি মানুষের দুর্বলতা চিরায়ত। প্রিন্টেট যেকোনো কিছু মানুষের কাছে ঐশ্বরিক বাণীর মতো সত্য মনে হয়। ছাপা পত্রিকাও তাই। বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে এখনও ছাপা পত্রিকা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। তা না হলে ইউরোপ-আমেরিকার সংবাদপত্র অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যেত। তা তো হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পত্রিকার সার্কুলেশন আরও বেড়েছে। আবার কোনো কোনো নামি পত্রিকার ‘প্রিন্ট ভার্সন’ বন্ধ হওয়ার খবরও আমরা জানি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকাটি করোনাকালে অনেক সংকটে থাকলেও সার্কুলেশনে কোনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু বাংলাদেশের সব পত্রিকাই কঠিন সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে।
যতই দিন যাচ্ছে ছাপা পত্রিকার টিকে থাকার লড়াইটা জোরেশোরে শুরু হয়েছে। ডিজিটাল মিডিয়ার কারণে মানুষ যখনকার খবর তখনই জানতে পারছে। পরদিন পত্রিকার পাতায় বাসি খবর আর মানুষ দেখতে চায় না। শুধু দিনের খবর দিয়ে পত্রিকা করা হলে তা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। পরের দিনের পত্রিকায় বাড়তি কিছু থাকতে হবে। দিনের বড় ঘটনা থাকলে সেগুলোর পেছনের ঘটনা, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, দুর্নীতি, অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবেদন দেখতে চায় মানুষ। যারা বিশেষভাবে পত্রিকাটি সাজাতে পারবে তারাই টিকে থাকবে। তবে ছাপা সংবাদপত্রের পাশাপাশি অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর জোর দিতে হবে। এখন সংবাদপত্রের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে ডিজিটাল মাধ্যম। এদিকটার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
গতানুগতিক ধারার পত্রিকার টিকে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ কী তা আমরা জানি। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কেও আমাদের ধারণা রয়েছে। এখন প্রয়োজন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া। এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক খবরের কাগজ ও কথাসাহিত্যিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও