দুজন লোক সংবাদপত্র পড়তেন। খুব যে শিক্ষিত এমন নয়। যুক্তাক্ষরযুক্ত বা অপ্রচলিত শব্দে আটকে যেতেন। তখন একজন আরেকজনের দ্বারস্থ। সমপর্যায়ের শিক্ষিত, কাজেই একজন আটকে গেলে অন্যজন তাকে পার করতে পারবেন এমন সুযোগ কম। আবার সরাসরি অক্ষমতা স্বীকারও করা যায় না। তিনি চশমা খুঁজতেন। সেটা পাওয়া যেত না বেশিরভাগ সময়। পাওয়া গেলেও খুব সুবিধা হতো না। বলতেন, ‘চশমাটা একদম গেছে। চোখ গেছে। তার পথ ধরে চশমাও।’
প্রথমজন ক্ষেপে যেতেন, ‘একটা শব্দ ধরতে পারছ না?’
‘তা তুমিও তো পারছ না।’
‘আমি তো এতগুলো পারলাম।’
‘তাও বটে কিন্তু ওগুলো আমিও পারতাম। তুমি যেটা পারো না, সেটা আমিও পারি না।’
ঐক্যের কথা। অতএব সন্ধি হয়ে যেত। সেই শব্দটা বাদ দিয়ে পরের শব্দ দিয়ে বাক্যটা বোঝার চেষ্টা করতেন। বুঝেও যেতেন। তারপর শুরু হতো আলোচনা। অবাক ব্যাপার ছিল, একটু আগে যারা ধুঁকছিলেন শব্দের বেড়াজালে, তখন তারা কী সপ্রতিভ! নানারকম বিশেষজ্ঞ মতামত।
এভাবেই পত্রিকা যুগে যুগে তৈরি করেছে কত বিশ্লেষক। তাদের বোধে, চিন্তায়, বিশেষজ্ঞতায় অনিবার্য সঙ্গী হয়ে থেকেছে নিউজপ্রিন্টের কিছু পাতা।
আরেকজনকে চিনতাম। তিনি স্টেশনে বসে থাকতেন। সেই সত্তর বা আশির দশকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পত্রিকা যেত ট্রেনে। ট্রেন থেকে নামার পর স্টল হয়ে হকারের হাতে করে তবেই বাসায়। অনেক ঘোরপথ। তিনি অপেক্ষা করতেন না। সবার আগে খবর জেনে তিনি তথ্যভান্ডার। তাই নিয়ে সামনের চায়ের দোকানে শুরু করতেন, ‘জানো...’
অন্যরা তার জানা দেখে অবাক। পরে পত্রিকা এলে ঘটনা পরিষ্কার হতো। তাতে কী! কিছু সময় তো তিনি সবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তখনকার সভ্যতায় সংবাদপত্র এভাবেই ছিল নিয়ন্ত্রক। আজও এত কিছু হয়েছে, তবু পুরোনো মানুষরা দেখবেন, কোনো কিছু কাউকে বিশ্বাস করাতে গেলে বলেন, ‘পত্রিকায় কিন্তু এসে গেছে...’
কেউ কেউ আবার ট্রেন ধরে দূরেও ছুটতেন আগে পত্রিকা পড়তে। পরীক্ষার ফলের ক্ষেত্রে ঘটত ঘটনাটা। এসএসসির ফল বেরিয়েছে, জেলা শহর থেকে পত্রিকা আসতে দুই-তিন ঘণ্টা লাগবে, অতক্ষণ টেনশনে থাকতে রাজি নন যারা, তারা চলে যেতেন দূরের শহরে। সেখানে পত্রিকায় ফল দেখে হয়তো টেলিফোনে জানালেন। কেনা হলো মিষ্টি।
খবরের যখন এই মূল্য তখন একাধিক পত্রিকা পড়ার লোভ কারও কারও থাকবে স্বাভাবিক। তখনকার অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খুব কম পরিবারেরই সামর্থ্য ছিল একাধিক পত্রিকা রাখার। তা হলে উপায়! হকারকে হাত করা। আমাদের এলাকার এক তরুণ হকারের সঙ্গে এমন সম্পর্ক করেছিলেন যে, তিনি সব পত্রিকা পড়ে ফেলতে পারতেন। নিয়মটা ছিল এমন, হকার প্রথম তার বাসায় বরাদ্দ পত্রিকা দিত, সঙ্গে অন্য বড় পত্রিকাগুলোর একেকটা কপি।
ওই এলাকার বিভিন্ন বাসায় পত্রিকা দিতে হকারের যে সময় লাগত, ততক্ষণই বরাদ্দ তরুণের জন্য। তার বাসায় রাখা হতো ইত্তেফাক, হকারের সঙ্গে সখ্যের সূত্রে তিনি পড়ে ফেলতে পারতেন দৈনিক বাংলা, সংবাদ, ইনকিলাব, বাংলার বাণী, দৈনিক খবরসহ আরও যা যা পত্রিকা আছে। ফলে তিনি মহাজ্ঞানী। তিনি জ্ঞান বিতরণ করতেন। আর বাকিরা অবাক হয়ে ভাবত, এত বাচ্চা ছেলে এত কিছু জানে কীভাবে!
পত্রিকার কথা যখন এলো তখন এও মনে পড়ে, দৈনিকের মাধ্যমে একটা মানুষ বা পরিবারের রুচি বা রাজনৈতিক অবস্থান মোটামুটি জেনে নেওয়া যেত। যেমন- যারা শুধুই নির্ভরযোগ্য খবর এবং মধ্যপন্থি রাজনৈতিক অবস্থান চান, তারা পড়তেন দৈনিক ইত্তেফাক। মানে, একটা বাসায় ইত্তেফাক আছে মানে তার রাজনৈতিক অবস্থান ভারসাম্যময়। বাসায় ইনকিলাব মানে ডানঘেঁষা। সংবাদ মানে বামঘেঁষা প্রগতিশীল, বাংলার বাণী মানে অবশ্যই আওয়ামী লীগ।
দৈনিক বাংলা থাকলে বোঝা যেত, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী মানুষ। যদিও সরকারি ট্রাস্টের পত্রিকা বলে দৈনিক বাংলার রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় সরকারের পক্ষে, তবু ফিচার-সাহিত্যসহ নানা বিষয়ের কারণে তারও একটা পাঠকপ্রিয়তা ছিল।
২. সেসব দিন চলে গেছে। দিন চলে যায়। একরকম থাকে না। থাকলে পৃথিবী এগোয় না। কিন্তু এই এগিয়ে যাওয়া পৃথিবীতে সংবাদপত্র কি কেবলই পুরোনো হাহাকারের গল্প নাকি আধুনিকতায়ও তার জায়গা আছে? এই প্রশ্ন উঠলে দেখবেন, ঠোঁট উল্টিয়ে লোকে বলবে, আরে দূর! পত্রিকা কি কেউ আর পড়ে নাকি এখন!
পড়ে না বটে, তবু খেয়াল করি, পত্রিকায় লেখা ছাপানোর জন্য আজও কিছু মানুষের কী মরিয়া আকুলতা। বটে, তাদের সিংহভাগই পুরোনো সময়ের মানুষ কিন্তু এখনকার তরুণদের অনেকেও ছাপা কাগজে নাম দেখতে উদগ্রীব। আরও খেয়াল করি, যখন কাউকে বলি, যে খবরটা অনলাইনে দিয়ে দেব তখন মুখটা যেন একটু ফ্যাকাশে।
এর মানে পত্রিকার প্রয়োজন আছে। জায়গা আছে আজও। আছে বলেই গত ছয়-সাত বছরে বড় আকারের অন্তত পাঁচটি পত্রিকা বেরিয়েছে। গত এক দশকের আলোচিত ১০টি খবরের তালিকা করলে দেখবেন সিংহভাগ পত্রিকা থেকেই আসা। এই নিয়ে আলাপে সেদিন বিজ্ঞ একজন বললেন, ‘অন্যরাও করে হয়তো। কিন্তু পত্রিকায় না এলে টিকে থাকে না।’
ওই যে টিকে থাকা- সেটার জন্যও পত্রিকার দরকার আছে। গভীর অনুসন্ধানের জন্যও পত্রিকার দরকার। সংবাদ এবং তার জবাবদিহিও তুলনামূলক বেশি করে নিশ্চিত হয় পত্রিকাতেই।
কিন্তু এই ধরে যদি আমরা মনে করি পত্রিকা বের করেই খালাস, তা হলেই ভুল। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে মূলটা ঠিক রেখে পুনর্বিন্যাস জরুরি। অনলাইন-সামাজিক মাধ্যমকে অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। আসলে মনে করতে হবে সহযোগী। এরা আছে বলেই না আগের মতো বিরাট সংখ্যার পত্রিকা ছাপার দরকার পড়ে না। বরং কম ছেপে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পৌঁছানো সম্ভব লাখো মানুষের কাছে। এসব সুবিধা ব্যবহার করে টিকতে হবে। টিকতে গেলে তাই বদলাতে হবে।
আর সবসময় মন্ত্রের মতো মাথায় রাখতে হবে একটা শর্ত। ডিজিটাল জগৎকে আমরা ব্যবহার করব। তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হব না। তাদের বাতাসটা গায়ে মাখব। সেই বাতাসে উড়ে যাব না।
তা হলেই পত্রিকা থাকবে। সংবাদমাধ্যম থাকবে। ঠোঁট ওল্টানো লোকেরাও চুপি চুপি দেখে নেবে, আজকের কোন কাগজ কী লিখল!
লেখক : সম্পাদক, আগামীর সময়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও