সাংবাদিকতার পথ কখনোই মসৃণ নয়। অমসৃণ এই পথ ধরেই সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। হোক তা একজন রিপোর্টার বা ফটোসাংবাদিক। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই রিপোর্টার আর ফটোসাংবাদিক গণমাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ভাবপ্রকাশ বা মনোযোগ আকর্ষণে একটি ছবি অনেক ক্ষেত্রে সহস্র শব্দের চেয়ে বেশি কার্যকর।
ফটোসাংবাদিকতার ইতিহাস দেখতে হলে দেখা যায়, ১৯২৫ সালে আধুনিক ফটোসাংবাদিকতার চর্চা শুরু হয় জার্মানিতে। কারণ সে বছরই জার্মান প্রযুক্তিবিদরা আবিষ্কার করে ৩৫ মিলিমিটারের লাইকা ক্যামেরা। তবে ১৯৩৩ সালে ফটোসাংবাদিকতার নতুন মোড় নেয়। গণমাধ্যমে ফটোসাংবাদিকতার ভূমিকা কোনোভাবে অস্বীকার করা যায় না। কারণ আলোকচিত্র হচ্ছে জীবনের অনুবাদ।
এখনকার গণমাধ্যমে যারা ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন তারা আমাদের সময়ের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। আবার ডিজিটাল ক্যামেরা আসার পর থেকে ফটোসাংবাদিকতা আরও অনেক সহজ হয়ে গেছে। সাদাকালো থেকে এখন রঙিন ছবি গণমাধ্যমে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যা আমাদের সময় ছিল না।
আমাদের সময় ফটোসাংবাদিককে যেসব ঝুঁকির মুখে কাজ করতে হয়েছে তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এখন ফটোসাংবাদিকরা মোবাইলে ছবি তুলে তা ছাপতে পারে। একই সঙ্গে ভিডিও করতে পারে। আমি যখন রয়টার্সে কাজ করতাম তখন ছবি তাৎক্ষণিকভাবে পাঠাতে হতো। আর সেই ছবি পাঠাতে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হতো।
এখনকার ফটোসাংবাদিকদের তোলা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে শেয়ার হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সে সুযোগ ছিল না বললেই চলে। এখন যারা ফটোসাংবাদিকতায় কাজ করছেন তারা অনেক পরিশ্রমী। তবে কথা প্রসঙ্গে বলতে হয়, সাম্প্রতিক ঢাকায় যে ভারী বৃষ্টি হয়ে গেল, তাতে অনেক রাস্তা ডুবে যায়; কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ করার মতো, তা হলো ঘুরেফিরে যেন একই স্থানের জলবদ্ধতার ছবি পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে।
ফটোসাংবাদিকরা যথেষ্ট নিবেদিত হলেও এ ক্ষেত্রে অনেক মানবিক ছবি উঠে আসতে পারত। মানুষের দুর্ভোগের ছবি এসেছে, এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি অনেক মানবিক ছবি আড়ালে রয়ে গেছে। গণমাধ্যম এমন একটি স্থান যে পাঠকের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে অতৃপ্তি থেকেই যায়। সেই অতৃপ্তির জায়গাটা কোথায় তা উপলব্ধি করার সময় এসেছে।
ফটোসাংবাদিকদের গণমাধ্যমে কী ভূমিকা রয়েছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ছোট ছোট ছবি অনেক কথা বলে। যা পাতাজুড়ে রিপোর্ট লিখেও শেষ করা যাবে না। এখন কোনো ছবি কেউ যদি মিস করে তা হলে সে অনায়াসে তার বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু আমাদের সময় সে সুযোগ ছিল না। বরং প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা ছিল। আমি যখন রয়টার্সে তখন এপি আর এএফপির সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলত। কার ছবি গণমাধ্যম নেবে। আমি সে সময় চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেছি।
চ্যালেঞ্জ যে কী ধরনের ছিল তা না বলে পারছি না। ১৯৯১ সালে সাইক্লোনে আমাকে ১৭ দিন স্পটে যেতে হয়েছে। আবার সেই ছবি সেখান থেকে এসে রাত সাড়ে ৮টার মধ্যে পাঠাতে হয়েছে। আইলা ও সিডরের সময়ও একই অবস্থা। স্যাটেলাইটে ছবি পাঠিয়ে আবার সকাল ৭টার সময় স্পটে হেলিকপ্টারে যাওয়া। সেটি ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ।
একইভাবে রানা প্লাজার ঘটনা। সেদিন হরতাল। একদিকে হরতাল আবার অন্যদিকে রানা প্লাজার ঘটনা। দুটো মিলে সামলাতে হয়েছে। সবচেয়ে সুখের বিষয়, ছবি তুলেই সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে দেওয়ার সাড়ে তিন মিনিটের মধ্যে বিবিসিতে সেই ছবি দেখেছি। আমার সঙ্গে আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়ার সুস্থ প্রতিযোগিতা চলত।
আরও একটি ঘটনা। তা হলো শ্রীলঙ্কার সুনামি। কভার করতে গিয়ে কত যে হৃদয়বিদারক ছবি দেখলাম। রেললাইন আকাশে উঠে গেছে। রেলস্টেশন শুয়ে পড়েছে। কলম্বোর রাস্তায় সেই ছবির দৃশ্য আজও আমার মনে রেখাপাত করে। গণমাধ্যমের একজন কর্মী হিসেবে আমি এখন গৌরববোধ করি।
বাংলাদেশে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সিডর, সাইক্লোন সব যেন ছবির মতো ভেসে উঠে চোখের সামনে। গণমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে ছবি আর রিপোর্টের পার্থক্য সহজে অনুমান করতে পেরেছি। তবে ফটোসাংবাদিকদের গণমাধ্যমে ভূমিকা বা অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
আগের ফটোসাংবাদিকতা আর এখনকার ফটোসাংবাদিকতার পার্থক্য সহজে চোখে পড়ে। তবে এখনকার ফটোসাংবাদিকরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায় আমাদের সময় অনেক ক্ষেত্রে ছিল না বললেই চলে।
এরপরও বলব, ফটোসাংবাদিকদের আগে সংঘাত বা কোনো ধরনের সহিংস আন্দোলনের ছবি তুলতে গিয়ে নিজেদের জীবন সেফ রাখতে হবে। আমি যখন বিদেশে ট্রেনিং নিই তখন ট্রেইনার আগে স্মরণ করিয়ে দিতেন, ‘ইউর সেফটি ফার্স্ট’। আবার কীভাবে জীবন সেফ করতে হয়, সে ব্যাপারে ব্রিটেনে আমাদের ট্রেনিং নিতে হয়েছে। অদ্ভুত ছিল সেই ট্রেনিং। তবে আমার জীবনের বড় বড় দুঃখ হচ্ছে, আমি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১৫ মিনিটের ব্যবধানে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের ছবি তুলতে পারিনি।
আমি ২০০৮ সালে রয়টার্সের ‘ক্যামেরা অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পেয়েছি। সে পুরস্কার ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পাওয়া আমার সর্বোচ্চ পেশাগত পুরস্কার। তবে পাঠক বা দর্শকের পুরস্কারের চেয়ে বড় পুরস্কার আর হতে পারে বলে মনে হয় না।
অন্যদিকে গণমাধ্যমে ফটোসাংবাদিকতায় যেমন গৌরব আছে তেমনি রয়েছে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের পেশাগত জীবনে ফটোসাংবাদিকতায় এতটুকু উপলব্ধি করেছি, যারা আগামী দিনে এই পেশায় আসবেন বা থাকবেন, তাদের ফটো তোলার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী চিন্তা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এআই তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে দাঁড়াতে পারে।
লেখক : রয়টার্সের সাবেক ফটোসাংবাদিক
সময়ের আলো/কেএইচও