নৈতিকতা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রাণ। সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে সত্য, নির্ভুলতা, ন্যায়সংগতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর মূল কথা। কারণ সাংবাদিকতার চূড়ান্ত দায় জনস্বার্থের প্রতি।
বাংলাদেশে নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা অবশ্য সহজ নয়। রাজনৈতিক বিভাজন, নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ, বাজারের প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা- সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এক জটিল বাস্তবতার মধ্যে চলছে। এর প্রভাব পড়ছে সংবাদ পরিবেশনে। বাড়ছে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য, পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন, স্বার্থের সংঘাত ও সেন্সরশিপের অভিযোগ। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থাও কমছে।
তাই বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটা নৈতিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে, তা বোঝা জরুরি। এর সঙ্গে শুধু সাংবাদিকতার মান নয়, গণতন্ত্রের কার্যকারিতা, সুশাসন এবং সুস্থ জনপরিসরের প্রশ্নও গভীরভাবে যুক্ত। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটা সুযোগ এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্বও বটে। কিন্তু নৈতিক সাংবাদিকতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন। সেই অর্জনের জন্য এখন অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে জরুরি কাজ শুরু করতে হবে।
সবার জন্য একটি অভিন্ন আচরণবিধি : প্রথম কাজ হলো- ছাপা, সম্প্রচার ও ডিজিটাল গণমাধ্যমের জন্য একটি অভিন্ন আচরণবিধি প্রণয়ন ও কার্যকর করা। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের অধীনে সংবাদপত্রের জন্য কিছু নৈতিক নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর সাংবাদিকতা প্রায়ই আলাদা ও অস্পষ্ট নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে।
পাঠকের কাছে অবশ্য খবরের মাধ্যম নয়, খবরের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রধান। একটি ভুল তথ্য সংবাদপত্রে ছাপা হলে যেমন ক্ষতি হয়, টেলিভিশন বা ফেসবুকে প্রচারিত হলেও একই ক্ষতি হয়- কখনো আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে। ফলে মাধ্যমভেদে নৈতিকতার মান আলাদা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন এ ক্ষেত্রে একটি ভিত্তি দিয়েছে। এখন প্রয়োজন মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, সংবাদকর্মী ও ফ্রিল্যান্সারের দায়িত্ব আলাদাভাবে নির্ধারণ করে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় আচরণবিধি তৈরি করা। তবে সেটি সরকারের চাপিয়ে দেওয়া বিধিমালা হলে চলবে না। সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, মালিক, গণমাধ্যম গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং পাঠক-দর্শকের অংশগ্রহণে এটি প্রণীত হতে হবে।
আচরণবিধির মূল নীতিগুলোও পরিচিত : যাচাই ছাড়া তথ্য প্রকাশ না করা, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, ভুল হলে দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে সংশোধনী দেওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং শিশু, যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা।
এর সঙ্গে সংবাদ, মতামত ও বিজ্ঞাপনের সীমারেখা পরিষ্কার করতে হবে। অর্থের বিনিময়ে তৈরি কনটেন্টকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা পাঠকের সঙ্গে প্রতারণা। কোনো প্রতিবেদন স্পনসরড হলে তা এমনভাবে চিহ্নিত করতে হবে, যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন। ‘ব্র্যান্ডেড কনটেন্ট’, ‘পার্টনার কনটেন্ট’ বা ‘বিশেষ আয়োজনের’ অস্পষ্ট পরিচয়ের আড়ালে বিজ্ঞাপনকে সংবাদ বানানোর সুযোগ রাখা যাবে না।
গোপন সূত্রের সুরক্ষাও আচরণবিধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের তথ্য সাধারণত প্রকাশ্য উৎস থেকে পাওয়া যায় না। পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তথ্যদাতারা সাংবাদিকদের কাছে আসবেন না। একই সঙ্গে অপতথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভুয়া ছবি-ভিডিও এবং ঘৃণাবাচক বক্তব্য শনাক্ত করার প্রক্রিয়া প্রতিটি নিউজরুমের দৈনন্দিন সম্পাদনা ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
নৈতিকতার অর্থনৈতিক ভিত্তি দরকার : নৈতিক সাংবাদিকতা কেবল ব্যক্তিগত সততার বিষয় নয়; এর একটি অর্থনৈতিক ভিত্তিও আছে। যে সাংবাদিকের নিয়োগপত্র নেই, নিয়মিত বেতন হয় না, সামান্য ভুলে চাকরি হারানোর ভয় আছে এবং পরিবারের ব্যয় মেটাতে একাধিক পেশায় যুক্ত হতে হয়- তার ওপর নৈতিকতার পুরো দায় চাপানো সহজ, কিন্তু ন্যায্য নয়।
বাংলাদেশে অনেক সংবাদমাধ্যম নিয়মিত বেতন দিতে পারে না বা দিতে চায় না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বহু প্রতিনিধিকে বেতন না দিয়ে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। কোথাও তাদের বিজ্ঞাপন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। ফলে একই ব্যক্তি একদিকে সংবাদ সংগ্রহ করেন, অন্যদিকে বিজ্ঞাপন ও আর্থিক সুবিধার জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রশাসন বা রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্ভর করেন। এই ব্যবস্থার মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রায় অনিবার্য।
তাই সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, সময়মতো বেতন, প্রযোজ্য মজুরি কাঠামো, পেশাগত নিরাপত্তা এবং ন্যায্য পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। ফ্রিল্যান্স ও চুক্তিভিত্তিক সাংবাদিকদের কাজের শর্ত, পারিশ্রমিক এবং আইনি সুরক্ষাও স্পষ্ট হওয়া দরকার। নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে আসা সাংবাদিকদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বৈষম্য দূর করতে হবে।
একজন সাংবাদিককে মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে তার কাছে ঘুষ প্রত্যাখ্যানের নৈতিক সাহস প্রত্যাশা করা প্রতিষ্ঠানের দ্বিচারিতা। সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অসততার বিচার অবশ্যই হবে, কিন্তু তাকে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেওয়া কাঠামোরও জবাবদিহি করতে হবে।
মালিকানার পরিচয় কেন গোপন থাকবে : বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত বহুত্ববাদ একই হারে বাড়েনি। অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। এর প্রভাব পড়ে সংবাদ নির্বাচন, শিরোনাম, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নীরবতার ওপরও।
প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের পরিচয় প্রকাশ করা তাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। মালিকের অন্য কোনো ব্যবসা আছে, সরকারের সঙ্গে তার কী ধরনের আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি সরকারি বিজ্ঞাপন, বেসরকারি বিজ্ঞাপন, অনুদান বা বিদেশি তহবিল থেকে কত আয় করছে- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।
স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বার্ষিক আর্থিক নিরীক্ষার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য নিয়ম না থাকলে বিজ্ঞাপন পুরস্কার বা শাস্তির অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। পাঠকসংখ্যা, প্রচার, জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতা ও শ্রম আইন অনুসরণের মতো প্রকাশ্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন করা উচিত।
সাংবাদিকরা সংবাদের উৎসের কাছ থেকে অর্থ, মূল্যবান উপহার বা বিশেষ সুবিধা নিতে পারবেন না। একইভাবে মালিকও নিজের অন্য ব্যবসার প্রচার, প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেয় করা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবেন না। নৈতিকতা শুধু প্রতিবেদকের জন্য নয়; মালিক ও সম্পাদকের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
নিয়ন্ত্রণ নয়, কার্যকর স্বনিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনো জবাবদিহি না থাকাও সমাধান নয়। ভুল, অপতথ্য, চরিত্রহনন ও গোপন বিজ্ঞাপন চলতে থাকলে মানুষের আস্থা আরও কমবে। এই দুই বিপদের মাঝখানের পথ হলো কার্যকর স্বনিয়ন্ত্রণ।
প্রতিটি বড় ও মাঝারি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন পাঠক-দর্শক সম্পাদক থাকা উচিত। তিনি পাঠকের অভিযোগ গ্রহণ করবেন, সম্পাদকীয় ভুল বা নৈতিক লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করবেন এবং তার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করবেন। অভিযোগ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগের প্রাপ্তিস্বীকার, তদন্ত ও নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতাও থাকা দরকার।
নাগরিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ : সংবাদমাধ্যমের নৈতিক সংকটকে শুধু মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিকের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এখন নাগরিকরা একই সঙ্গে তথ্যের ভোক্তা, উৎপাদক ও পরিবেশক। একটি যাচাইহীন পোস্ট কয়েক মিনিটে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বা সংঘাতের সময় একটি পুরোনো ছবি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভিডিও বাস্তব সহিংসতার কারণ হতে পারে।
তাই দেশজুড়ে গণমাধ্যম-সাক্ষরতার কর্মসূচি দরকার। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে উৎস যাচাই করতে হয়, সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য বুঝতে হয় এবং সন্দেহজনক ছবি-ভিডিও শনাক্ত করতে হয়। প্রতিটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ফ্যাক্টচেকিং ব্যবস্থা থাকা উচিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও প্রকাশ্য নীতি প্রয়োজন। এআই দিয়ে তৈরি ছবি, কণ্ঠ বা লেখা ব্যবহৃত হলে তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। সাংবাদিকের যাচাই ছাড়া এআইয়ের তৈরি তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। প্রযুক্তির গতি সাংবাদিকতার মূল দায়িত্বÑ সত্যতা, প্রাসঙ্গিকতা ও মানবিকতা বদলে দিতে পারে না।
বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ রক্ষাকবচ : ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যম কিছু নতুন সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, সরকারের সমালোচনা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি; মতের বৈচিত্র্যও অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত। সংগঠিত গোষ্ঠী, দলীয় কর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনতা এখন নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে। কোনো বন্ধুভাবাপন্ন সরকারকে প্রশ্ন করতে না পারা সংবাদমাধ্যম প্রতিকূল সরকারের সময়ও স্বাধীন থাকতে পারে না।
এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা শুধু আইন নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা। সেই বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় প্রতিদিন : যাচাই করা তথ্যে, দৃশ্যমান সংশোধনীতে, চিহ্নিত বিজ্ঞাপনে, প্রকাশ্য মালিকানায় এবং ক্ষমতার প্রতি সমান দূরত্বে।
মালিককে দিতে হবে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয় সম্পদ। সম্পাদককে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিককে ধরে রাখতে হবে যাচাই ও সততার অভ্যাস। নাগরিককে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য গ্রহণ ও প্রচার করতে হবে। এই চার পক্ষের সম্মিলিত অঙ্গীকার ছাড়া কোনো আচরণবিধিই কার্যকর হবে না। সুযোগ এখনও আছে। কিন্তু সুযোগ অনন্তকাল থাকে না। সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তি ফেরানোর কাজটি কঠিন বলেই তা পরে করার বিষয় নয়; বরং এখনই শুরু করার বিষয়।
সহযোগী অধ্যাপক
এমসিজে বিভাগ, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে