যুবসমাজই দেশের প্রাণশক্তি, পরিবর্তনের অগ্রদূত ও ভবিষ্যতের নির্মাতা। তরুণদের অদম্য উৎসাহ ও সাহসিকতা দিয়েই নতুন পৃথিবী গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুবর্ণ সময় (২০০৭-২০৪০) চলছে, যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কর্মক্ষম এবং তরুণ। তাই তরুণদের জন্য সরকারের ভাবনা এবং করণীয় নির্ধারণের এখনই গুরুত্বপূর্ণ সময়।
জাতিসংঘের হিসাবে পৃথিবীতে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রায় ২০০ কোটি মানুষ রয়েছে, যারা তরুণ এবং তারা মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ। বাংলাদেশের ‘জাতীয় যুবনীতি’ অনুসারে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের ‘যুব’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বয়সসীমার জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ; যা আনুমানিক ৫ কোটি। আন্তর্জাতিক যুব দিবস প্রতি বছর ১২ আগস্ট পালিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০০ সালের ১২ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাপী এটি পালিত হয়ে আসছে। এই বছরে দিবসটির মূল বিষয়বস্তু হলো ‘টেকসই ভবিষ্যতের জন্য যুব ক্ষমতায়ন’ এবং এর স্লোগান হলো ‘যুবকদের ক্ষমতায়ন, আগামী নির্মাণ’।
সমাজ গঠনে যুবসমাজের ভূমিকা
একটি আদর্শ সমাজ গঠনে যুবকদের ভূমিকা অপরিসীম। অফুরন্ত প্রাণশক্তি, অদম্য সাহস ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে তারা সমাজের সব অন্যায়, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করে একটি ন্যায়পরায়ণ ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। যুবকরা তাদের সততা, আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে সমাজকে অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে পারে। যেকোনো সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি, মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়াতে যুবসমাজ সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের যুবসমাজ, দরিদ্রদের সহায়তায়, পরিবেশ রক্ষা এবং দুর্যোগকালীন আর্তমানবতার সেবায় সবার আগে এগিয়ে আসে। নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করতে শিক্ষিত যুবকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে বাংলাদেশের যুবসমাজ তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা তৈরি ও অর্থনীতি এবং সামাজিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের নানা ক্ষেত্রে যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং, শান্তির পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হতেও দেখা গেছে যুসমাজকে। বিশ্বব্যাপী নিজেদের অধিকারের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণবাদবিরোধী, অসাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তরুণরা সোচ্চার। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি প্রধানত নির্ভরশীল যুব জনগোষ্ঠীর ওপর।
প্রবাসী শ্রমিক ও তৈরি পোশাক শিল্পে যুবসমাজের অংশগ্রহণই বেশি। তাই দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য যুবসমাজকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণীত হওয়া দরকার যথাযথ কর্মপরিকল্পনা।
বাংলাদেশের যুবসমাজের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
যুবসমাজ হলো একটি জাতির মেরুদণ্ড। যুবকদের সঠিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিলে তারা ক্ষমতায়িত হয় এবং একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বাংলাদেশের যুবসমাজের প্রধানত চারটি সমস্যা রয়েছে যা তাদের উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে । যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত, পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত, কর্মমুখী ও যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং শারীরিক চর্চা এবং সুস্থ বিনোদন থেকে বঞ্চিত। আমাদের যুবসমাজের খেলাধুলার জন্য মাঠের স্বল্পতা বিশেষ করে শহরে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব রয়েছে। মফস্বল বা গ্রামীণ এলাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্র কম। অনেক সময় সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বরাদ্দের অভাবে যুবকরা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায় না।
বাংলাদেশে মোট মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ, যার একটি বড় অংশ বা প্রায় ৮০ শতাংশই তরুণ ও যুবক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী দেশে মাদকাসক্তদের একটা বড় অংশ কিশোর ও যুবসমাজ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ বা প্রায় ১২ কোটি ৫২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার কেনার প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য নেই। পুষ্টিকর খাবার কিনতে দক্ষিণ এশিয়ায় আর্থিক অসমর্থ দেশের মধ্যে পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশ। পুষ্টিকর খাবার খেতে না পেয়ে এখনও ৩৩ শতাংশ শিশুর শারীরিক বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না এবং এই শিশুরাই ক্রমে যুবক হচ্ছে। তাদের পুষ্টিকর খাবারের অভাবে কগনেটিভ ডেভেলপমেন্ট হয় না, তাদের দক্ষতা কমে এবং সার্বিকভাবে দেশের উৎপাদন ক্ষমতা কমে।
একই সঙ্গে চাকরি, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে না থাকা যুবকদের সংখ্যা বাংলাদেশে অনেক বেশি। দেশের মোট বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে বাংলাদেশে এই হার ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বেশি এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের চেয়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক বেকার, যা মোট যুব শ্রমশক্তির প্রায় ৭.২ থেকে ৯.৪ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৩১.৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী। চাকরি, পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নেই ৩০ শতাংশের।
বাংলাদেশে যুবগোষ্ঠীর বড় অংশই আর্থসামাজিক ঝুঁকির মধ্যে আছে। বৈষম্য আর গুণগত শিক্ষার অভাবে যুবসমাজের মধ্যে হতাশা বিরাজ করে। দেশের বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক আমাদের যুবসমাজের মাঝে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে নানাভাবে। ডিচ দ্য লেবেল নামে অ্যান্টি বুলিং বা উৎপীড়নবিরোধী একটি দাতব্য সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের ভীত ও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। জরিপে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইনস্টাগ্রামকে অত্যন্ত নেতিবাচক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।
যুবকদের সৃজনশীলতাকে সুরক্ষা দিতে হবে, উৎসাহী করতে হবে জ্ঞানচর্চায়। বেকারত্ব, চাকরিতে তদবির বাণিজ্য, শিক্ষাজীবনের সেশনজট আর বিনোদনের অভাব তরুণদের বিকশিত হওয়াকে এবং ভবিষ্যত স্বপ্নকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুবসমাজের জন্য সরকারের করণীয়
তরুণ সমাজকে আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে এবং বিশ্বনাগরিক করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তির বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তরুণদের ক্ষমতায়নে বৈশ্বিক উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং ইতিবাচক পরিবর্তনে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তরুণসমাজের জন্য স্কুল-কলেজসহ সর্বত্র খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখার জন্য তাদের সামনে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জীবনের মূল্য তুলে ধরতে হবে। সমাজের সুশিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তাদের হতাশামুক্ত করবে এবং বিশ্বনাগরিক হিসেবে তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দেবে।
সরকার ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারগুলো পালন করলে তরুণসমাজকে সহজেই ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে।
সরকারি ও বেসরকারি সব ক্ষেত্রে চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত করে প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্নকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে, তাতে করে প্রকৃত মেধাবীরা মূল্যায়িত হবে এবং তরুণসমাজের মধ্যে হতাশা প্রশমিত হবে। বাংলাদেশে যুবসমাজের অসীম সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা তরুণদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে নানা ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করছে, সেগুলোকে আরও যুগোপযোগী এবং বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিস্তৃত করতে হবে। যুগপোযোগী ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তরুণসমাজকে দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
অতিরিক্ত সচিব (অব.)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি