নূরুল কবীর। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক স্বতন্ত্র ও স্পষ্টভাষী নাম। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক হিসেবে নূরুল কবীরের পরিচিতি গড়ে উঠেছে। তিনি বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সভাপতিও। তিনি প্রশংসিত তার দৃঢ় সম্পাদকীয় অবস্থান, নির্ভীক সাংবাদিকতা এবং প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করার সাহসিকতায়। বাংলাদেশের বাংলা ও ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের অপূর্ণতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বহুবার। তেমনই এক পূর্ব প্রকাশিত আলোচনা তুলে ধরা হলো সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য
বাংলাদেশের ইতিহাসের পাকিস্তান পর্বে এ দেশের সাংবাদিকতা গড়ে উঠেছিল প্রধানত বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের অনুষঙ্গ হিসেবে।পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক জাতিগত শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির তৎকালীন সাংবাদিকতা স্বভাবতই ছিল রাজনীতি-জর্জর-জাতীয়তাবাদী আকাক্সক্ষার প্রতিরূপ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সমকালীন সাংবাদিকতা তার সেই প্রাথমিক দায় থেকে মুক্ত হয়ে প্রবেশ করেছে জাতীয় জীবনের বৃহত্তর পরিসরে।
আর তার তৎপরতা সম্প্রসারিত করেছে জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা অলিন্দে। এরই মধ্যে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা সাংবাদিকতাকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে পেশাদারিত্বের ‘আন্তর্জাতিক মান’ মাথায় রেখে। তবে সমকালীন সাংবাদিকতার কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে।
দ্বিদলীয় রাজনীতির যে অসুস্থ বিকাশ আমাদের সমাজকে খাড়াখাড়িভাবে বিভক্ত করে ফেলেছে, তা সংক্রমিত করেছে আমাদের সাংবাদিকতাকেও। দলীয় রাজনীতি প্রভাবিত স্বার্থান্ধ সাংবাদিকতা সমাজকে সৃষ্টিশীলতাবর্জিত বন্ধ্যা মেরুকরণের উপাদান জুগিয়ে চলেছে নিরন্তর। তবে এ কথাও সত্য যে, সংবাদকর্মীদের একটা অংশ, তা এ মুহূর্তে যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, এই আত্মঘাতী মিডিয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সচেতন লড়াইয়ে নিয়োজিত রয়েছে। এসব সংবাদকর্মী শাসকশ্রেণির দলীয় স্বার্থান্বেষী রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করা ও সেসব তথ্যের জনস্বার্থপরায়ণ বিশ্লেষণ প্রকাশ করার ভেতর দিয়ে মানুষের যথার্থ গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ সাধনে নিয়োজিত রয়েছেন।
পেশাগত দিক থেকে বাংলাদেশের সমকালীন সাংবাদিকতা, তার অনেক সীমাবদ্ধতাসহ দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের মূলধারার সাংবাদিকতার তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত। এখনও অনেক বেশি জীবনমুখী, এখনও করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণাধীন মিডিয়া স্থাপনার জীবনবিমুখ মুনাফালিপ্সার অসহায় শিকারে পরিণত হয়নি এ দেশের সাংবাদিকতা।
আবার আধুনিক শিল্প বিকাশের স্তর হিসেবে বিবেচনা করলে, আমাদের সংবাদপত্র শিল্প দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের মূলধারার মিডিয়া ব্যবস্থার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এখানকার মিডিয়া স্থাপনাগুলো, গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে, এখনও রুগ্নশিল্প ছাড়া কিছু নয়। মূলধারার অধিকাংশ পত্রিকা এখনও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এদের অধিকাংশের মুনাফাই আবার প্রধানত সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল।
আমাদের দেশে বাংলা ও ইংরেজি সাংবাদিকতা বরাবরই সমান্তরালভাবে প্রবহমান। প্রধানত বাংলাভাষী অধ্যুষিত এ দেশের বৃহত্তর পাঠক সমাজের ওপর স্বভাবতই বাংলা সাংবাদিকতার প্রভাব অনেক বেশি। বাংলা সাংবাদিকতা নিজেও সে সম্পর্কে বরাবরই সচেতন থেকেছে, ফলে জনজীবনের বিচিত্র সংকট ও সম্ভাবনা উপজীব্য হয়েছে বাংলা সাংবাদিকতায়।
তবে চটকের প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বলতা বাংলা সাংবাদিকতার একটা সাধারণ সীমাবদ্ধতা বলে আমার মনে হয়। অন্যদিকে ইংরেজি সাংবাদিকতা এখনও বেশ খানিকটা এলিটিস্ট। এটাই তার প্রধান দুর্বলতা। ইংরেজি সাংবাদিকতা চটকের কাছে খুব কমই মাথা নুইয়েছে। ঋজুতা তার একটা বড় শক্তি। বাংলা সাংবাদিকতার উচিত আরও ঋজু দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা, আর ইংরেজি সাংবাদিকতার উচিত আরও গণমুখী ভূমিকা গ্রহণ করা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও