বাধাহীন স্বাধীনতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের বেশ কিছু ভূমিকা থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দায়িত্বশীল আচরণ করা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনব্যবস্থা আশা করেছিলাম। কিন্তু বার বার হোঁচট খেতে হয়েছে।
গণমাধ্যমের একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সংবাদ সংস্থা। শুধু বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও সংবাদ সংস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে সংবাদ সংস্থা যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অগণিত পাঠক থেকে শুরু করে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তথ্য সরবরাহ করে। এই তথ্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যম একটি সত্যিকার অর্থে পাঠক ও দর্শকদের কাছে একটি আস্থার স্থান করে নেয়। একটি প্রিন্ট মিডিয়া যখন তাদের সংবাদ প্রকাশ করে তখন সেই সংবাদ কিন্তু অন্য প্রিন্ট মিডিয়া ছাপে না।
বিশেষ করে বিশেষ সংবাদগুলো ছাপার কোনো অবকাশ থাকে না। কিন্তু সংবাদ সংস্থার বিষয়ভিত্তিক যেকোনো সংবাদ প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও বেতারে সরবরাহ করা হয়। আর তা প্রচার কিংবা প্রকাশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে সব ধরনের সংবাদ পৌঁছে যায়। আর পাঠক ও দর্শক এসব সংবাদে শুধু যে উপকৃত হয় তাই নয়, সার্বিক দেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই সংবাদ সংস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করার সুবাদে আমি মনে করি গণমাধ্যমে দেশ ও দশের অনেক উপকার করতে পারে। সরকারের যেমন ভুল-ভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়া যায়, তেমনি একটি গাইড লাইনও দেওয়া সম্ভব। দেশে গণতন্ত্র ধারা বজায় রাখা ও গণতন্ত্র বিকাশে গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদ সংস্থরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা সে ক্ষেত্রে অবদান রেখে আসছে। সংবাদ সংস্থার একটি সংবাদ বিশ্বাসযোগ্যতার দাবি রাখে। এই সংস্থার সংবাদ যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হয়। পশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদও পরিবেশনা করা হয়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সঙ্গে বিদেশি অনেক সংবাদ সংস্থার চুক্তি রয়েছে। যেন তাদের সঙ্গে মিলেমিশে আন্তর্জাতিক সংবাদ সরবরাহ করা যায়।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সরবরাহ করা সংবাদ প্রিন্ট মিডিয়া বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার করা হয় কিংবা ছাপানো হয় তখন সংশ্লিষ্টরা ক্রেডিট লাইন ব্যবহার করে। সে ক্ষেত্রে পাঠক ও দর্শকদের কাছেও সংবাদ গ্রহণযোগ্যতা পায়। আজ এই ডিজিটাল ও অনলাইন যুগে এ সংস্থারও অনলাইন ও ডিজিটাল মিডিয়া রয়েছে। যেন দর্শক বা পাঠকরা সবশেষ সংবাদ থেকে বঞ্চিত না হয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে। আমরা যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই তা হলে দেখা যাবে দেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে গত ২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের অনেক ভূমিকা ছিল। নব্বইর গণআন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সাংবাদিকদের ভূমিকা অবশ্য প্রশংসনীয়। তবে এরশাদের সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। সে সময় পিআইডি থেকে গণমাধ্যমে ফোন আসত। সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকত। সে সময় সাংবাদিকদের মধ্যে একতা ছিল। এক্যবদ্ধ ইউনিয়ন অনেক সংগ্রাম করেছে। এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, সংগ্রামের অংশ হিসেবে একনাগাড়ে বেশ কিছুদিন সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ ছিল। আবার ১/১১-এর সময়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হলো, সংকুচিত হলো। নানাভাবে মিডিয়াকে হয়রানি করার চেষ্টা চলেছে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর নানা ধরনের আইন-কানুন তৈরি করা হলো। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্নই শুধু করেনি; ভিন্নমতের গণমাধ্যম বন্ধ করার উদ্যোগ নিল। সে সময় আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, সিএসবি, চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টিভি বন্ধ হয়ে যায়। বিরোধী দলের মুক্তচিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে তুলল। সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো মিডিয়া। দিন শেষে দেশের কোনো লাভ হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু না হলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম আবার কিছুটা স্বাধীনতা পায়। তবে বাধাহীন স্বাধীনতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের বেশ কিছু ভূমিকা থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দায়িত্বশীল আচরণ করা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনব্যবস্থা আশা করেছিলাম। কিন্তু বার বার হোঁচট খেতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনব্যবস্থার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। গত পাঁচ মাসে এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো হস্তক্ষেপ দেখিনি। এটি গণমাধ্যমের জন্য অবশ্যই আশার আলো। তবে স্বাধীনতা পেলাম বলে যা খুশি তাই লিখব বা প্রকাশ করব, এটা দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে পড়ে না।
গণমাধ্যম সবসময় জনপক্ষের থাকবে। এর ফলে দেশ যেমন এগিয়ে যাবে। তেমনি সরকারও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে পারবে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকতে পারে। কিন্তু এমন কিছু আচরণ করা ঠিক হবে না, যাতে সমাজে অস্থিরতা বিরাজ করে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে। এটাই তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে গণমাধ্যমে অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরতে হবে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এই মাল্টিমিডিয়া আর অনলাইনের যুগে প্রিন্ট মিডিয়া কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। ডিজিটাল যুগে বসবাস করে এই গণমাধ্যমের বাইরে থাকতে পারে না। প্রিন্ট মিডিয়াতে এমন কনটেন্ট থাকা প্রয়োজন যেন পাঠক নতুনত্ব কিছু পায়। এরপরও বলব, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই গণমাধ্যম বেঁচে থাকবে।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, বাসস
সময়ের আলো/আআ