এখন জুলাই অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশ। এখন অমানিশার অবসান হয়েছে। ফিরে এসেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার যে সর্বনাশ হয়ে গেছে, ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, সেই দূষণ থেকে এই মাধ্যমটিকে আবার বিশ্বাস ও আস্থার কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর যাতে কোনো দালাল সাংবাদিকের বংশ বৃদ্ধি না হয়, সেদিকেও রাখতে হবে তীক্ষ্ণ নজর।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ সালে তার ধূমকেতু পত্রিকায় যেদিন ঔপনিবেশিক শাসন উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, সেদিন থেকেই সংবাদপত্র হয়ে ওঠে গণমানুষের কণ্ঠস্বর। নজরুলের আগে আর কেউই এই স্বাধীনতাস্পৃহার আশপাশে ছিলেন না।
সেই সময়টা কেমন, রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবী তখন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের উদ্ধত থাবার নিচ থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। দেশে দেশে আছড়ে পড়ছে তার ঢেউ। নজরুলেও আছে সেই আলোর অনুরণন। নজরুলের আগের ভারতবর্ষের সংবাদপত্র ছিল ‘ঝামা ধরা ধামা ধরা’। ঔপনিবেশিক শাসকদের পায়ের ওপর পড়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো কাজ ছিল না।
মাঝেমধ্যে মনে হয় মহান লেনিনের অবিনাশী উক্তি, ‘মানুষের চিন্তা আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে বেশি মারাত্মক’ যেন নজরুলকে উদ্দেশ করেই বলা। যেন এরপর থেকেই সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের গুরুত্ব পাওয়ার দিন শুরু হয়। অ্যাডমন্ট বার্ক বলে বসলেন, সংবাদপত্র হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। অনেকের ধারণা গণমাধ্যম হলো জাতির আয়না। নিজেকে দেখা ও জানার জানালা। বিখ্যাত লেখক ওসকার ওয়াইল্ড তো বলেই ফেললেন, আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৮ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশ শাসন করার সুযোগ পান। কিন্তু একজন সাংবাদিক আমৃত্যু জনমনকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
সাংবাদিকতা নিয়ে তেমন কাব্য বা কবিতা আমাদের ভাষায় লেখা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ:
‘খবর কেবল দিতে পারি চেয়ো না অধিক/ একটি খবর জেনে রেখো আমি সাংবাদিক/ রাষ্ট্রনীতির কাটি জাবর/ নেই আমার ঘরের খবর/ গুলির মুখে ঝড়ের বুকে আমি যে যাত্রিক।’
এসব তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি এ কারণেই যে, তখনকার দিনে সংবাদপত্রকে মনে করা হতো সাধারণ মানুষের শিক্ষক : এক সমাপ্তিবিহীন গ্রন্থ।
এরপর এলো পতনের যুগ। পচন ধরার কাল। ভারতীয় লেখক প্রমথনাথ বিশী তো সাংবাদিকতাকে উড়িয়ে দিয়ে ঘোষণা করলেন, যখন দেখবে কেউ একজন সব বিষয়ে বোলচাল ঝাড়ছে, তখন ধরে নিতে হবে এই ব্যক্তি একজন সাংবাদিক। এরা হলো জ্যাক অব অল ট্রেড, মাস্টার অব নান।- গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর বিশ্ববিশ্রুত কথা, বুদ্ধি যখন প্রবল, লালসা সেখানে দুর্বল।
প্লেটোর উক্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে আমাদের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও সংবাদসেবীরা। তাদের বুদ্ধি যত বেড়েছে, তারা ততই দুর্নীতিবাজ ও লালসাকাতর হয়ে উঠেছেন। এই বক্তব্যেরই তাজ্জব করা সমর্থন আমরা দেখব, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার তথ্য উপদেষ্টা আকবর কবীরের প্রতিবেদনে। যে প্রতিবেদনের আওতায় রাষ্ট্রপতি জিয়া প্রেস ক্লাবের ভূমি ও ভবন নির্মাণ, প্রেস ইনস্টিটিউট ও প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন। আকবর কবীর তার প্রতিবেদনের শুরুতেই লিখেছিলেন, এই সম্প্রদায়টি পরিপূর্ণভাবে বিবেকবর্জিত, চরিত্রহীন ও ক্রয়যোগ্য।
মরহুম আকবর কবীরের প্রতিবেদনটি সে সময় অনেককেই আশ্চর্য ও ব্যথিত করেছিল। ঢালাওভাবে এ ধরনের মন্তব্য করা অস্বস্তিকর। কিন্তু এই কথাগুলোকে অস্বীকার করাও সহজ নয়। কেন সহজ নয়, তার প্রমাণ গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের দিনগুলোতে আমাদের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট ভূমিকা। গণমাধ্যমের ঘাড়ে সওয়ার হওয়া সাংবাদিক নামধারী কয়েকশ দুর্বৃত্ত পুরো গণমাধ্যমকে দালালি, তোষামোদি ও পদলেহনের কুৎসিত যন্ত্রে পরিণত করেছিল। গত ১৭ বছরে আমরা কী পেয়েছি এদের কাছ থেকে শুধু নীচুতা ও ভণ্ডামি ছাড়া। ফ্যাসিস্ট শাসকদের প্রতিনিয়ত কদমবুচি করাই ছিল এদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে পায়ে পিষে ফ্যাসিস্ট শাসকরা গত ১৭ বছরে ৭০ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে। শুধু ভিন্নমত অবলম্বন ও তাদের ফরমায়েশ মতো বার্তা না লেখার অপরাধে এই সাংবাদিকদের ঘাতক শাসকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। খুন হওয়ার বাইরে প্রায় ২ হাজার গণমাধ্যমকর্মী শিকার হন নানামুখী নির্যাতনের। হামলা, মামলায় জেরবার হয়ে যায় তাদের জীবন। এই শাসকরা বন্ধ করে দিয়েছিল শত শত গণমাধ্যম।
জুলাই জাগরণের পর ৫ আগস্ট জাতির ভাগ্যাকাশ থেকে দূর হয় ফ্যাসিবাদী দুঃশাসক। আমাদের সন্তানরা যখন বুকের রক্ত ঢেলে দেশকে দানবমুক্ত করার জন্য প্রাণ দিচ্ছিল, তখন এই সাংবাদিক নামধারী দালালরা এই মহাজাগরণের বিরুদ্ধে জঘন্য ভূমিকা পালন করে। সংগত কারণেই পুরো দেশকে হতবাক করে এই নোংরা লোকগুলো যে যেভাবে পেরেছে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। যারা পালাতে পারেনি তারা এখন কারারুদ্ধ। বাকিরা জনসমাগম থেকে সরে গাঢাকা দিয়ে আছে।
এখন জুলাই অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশ। এখন অমানিশার অবসান হয়েছে। ফিরে এসেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার যে সর্বনাশ হয়ে গেছে, ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, সেই দূষণ থেকে এই মাধ্যমটিকে আবার বিশ্বাস ও আস্থার কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর যাতে কোনো দালাল সাংবাদিকের বংশ বৃদ্ধি না হয়, সেদিকেও রাখতে হবে তীক্ষ্ণ নজর।
এবার দুটি মন্তব্যের জবাব। প্রমথনাথ বিশীর কাছে জিনিসটি ভালো লাগেনি বলেই তিনি কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরেই বলেছিলেন সাংবাদিকরা সব বিষয়ে কথা বলে। এর উত্তর হলো, হ্যাঁ সব বিষয়ে কথা বলে। কথা না বললে তার চলে না। তাকে কথা বলতেই হয়। কারণ আজ হয়তো তিনি চিকিৎসা নিয়ে রিপোর্ট করলেন। পরদিন তাকে হয়তো পাঠানো হলো অর্থনীতির সেমিনারে। এর পরদিন হয়তো তিনি গেলেন পানি সম্পদ বিষয়ে কাজ করার জন্য। এ রকম নানা বিষয়ে একজন সাংবাদিককে কাজ করতে হয়। যেটা প্রমথনাথ বিশীর জানা ছিল না।
আবার চাণক্য কিংবা জালালউদ্দিন রুমী বলেন, সেই শাসক উৎকৃষ্ট যিনি জ্ঞানীদের কাছে যাতায়াত করেন। আর সেই জ্ঞানীরা হলো নিকৃষ্ট যারা শাসকদের কাছে যাতায়াত করেন।- অন্য পেশার কথা বাদ দিচ্ছি। সাংবাদিকদের ফুটপাথ থেকে শাসকদের দরবার পর্যন্ত সর্বত্রই যাতায়াত করতে হয়। এটাই তার পেশা। এখানে সাংবাদিকদের ছাড় দিতে হবে। নইলে সাংবাদিকতা তার উৎকর্ষ ও গুরুত্ব হারাবে।
লেখক : কবি ও দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক