গণমাধ্যম কাদের দ্বারা পরিচালিত হবে? যদি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যবসায়ীর হাতে গণমাধ্যম পরিচালিত হয় সেখানে স্বাধীনতা হবে সেই ধরনের। আবার মালিকানার ধরন যদি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় হয় সেই গণমাধ্যম হবে আরেক ধরনের। সরকারের পক্ষ থেকে যদি গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব হয় তা হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জীবনেও হবে না
দেশে গণমাধ্যমের বিষয় আলোচনা করতে গেলেই প্রথমে আসে নিউজপ্রিন্ট। এরপর আসে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। তবে অনলাইনের কথা বলতে বোঝায় বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। বিডি নিউজই কিন্তু সবার আগে অনলাইন নিউজপেপার হিসেবে পাঠকদের কাছে পরিচিতি লাভ করে। ইন্টারনেটের সুবাদে চব্বিশ ঘণ্টা হালনাগাদ খবরাখবর পৌঁছে যায়। পাঠকদের কাছে সব খবর পৌঁছে দিতে প্রথমেই খেয়াল রাখতে হয়েছে বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
গণমাধ্যমকে এমন পণ্য তৈরি করতে হয় যা তারা বিক্রি করতে পারে। হোক তা অনলাইন, নিউজপ্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া। মিডিয়ার তথ্যই তার পণ্য। বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর সামাজিক দায়িত্ববোধের কারণেই গণমাধ্যমকে সততার সঙ্গে তুলে ধরতে হয় ঘটনা। তবে সবটাই সবসময় তুলে ধরছে তা নয়। যেটাকে গণমাধ্যম মনে করছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাকে তুলে ধরছে। বাছাই করছে। এটাই হচ্ছে গেট কিপিং।
এ কথা আর অস্বীকার করার উপায় নেই অনলাইন নিউজের ক্লায়েন্ট হিসেবে যুক্ত হয়েছে দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকাসহ অগণিত পাঠক। বিভিন্ন গণমাধ্যম তাদের প্রয়োজন অনুসারে বা তাদের দৃষ্টিতে অনলাইনের নিউজ গ্রহণ করে তা পাঠক ও দর্শকদের কাছে দ্রুত উপস্থাপন করছে। যে কারণে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা আর বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য গেটকিপার হিসেবে অনলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যা এখনও অব্যাহত।
অনলাইনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিডি নিউজ সেই প্রশ্নগুলো মাথায় রেখে কাজ করে আসছে। যে কারণে নিউজের গেট কিপিংয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। অনলাইনের সব শেষের নীতি হচ্ছে, একবারও ভুল করব না। হয়তো অনলাইনে নিউজ সরবরাহ করতে দেরি হতে পারে। কিন্তু সোর্স থেকে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিউজ ছাড়া যাবে না।
অনলাইনের নিউজের ব্যাপারে আমার মন্তব্য হচ্ছে, দ্রুত নিউজ না দেওয়ার চেয়ে ধীরে-সুস্থে নিশ্চিত হওয়ার পর দেওয়াই ভালো। গণমাধ্যমের কাজটি হচ্ছে এখানেই। কেন পাঠক বা দর্শক গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা রাখবে। তার প্রধান কারণ হচ্ছে নির্ভুল তথ্য প্রদান করা। তবে গণমাধ্যম যদি সঠিক তথ্য সরবরাহ বা প্রকাশ করতে না পারে তা হলে তার একদিকে যেমন ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে পাঠকদের আস্থা নষ্ট হতে পারে।
বর্তমান গণমাধ্যমের গুণগত মান অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। অনেক সময় দেখা যায় কোনো কোনো নিউজ পাঠকদের জন্য হাস্যকর হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয়ও মনে হতে পারে। বাংলাদেশে অতীতে এত গণমাধ্যম ছিল না। এখন এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে যে সেসবের গুণগতমান নিয়ে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে। কোনো দেশে কিন্তু এত গণমাধ্যমে নেই। গণমাধ্যমের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এখন যেকোনো গণমাধ্যমের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করে সেই বিনিয়োগ করা অর্থ উঠানো খুব কঠিন। তা হলে প্রশ্ন উঠতে পারে দেশে তো এখন অনেক পত্রিকা, টিভি চ্যানেল রয়েছে। সেগুলো চলছে কীভাবে?
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে কথা ওঠে। আসলে কি গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? আমি মনে করি স্বাধীনতা পেতে হলে একটা সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। যা হবে স্থিতিশীল। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যদি শক্তিশালী না হয় তা হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
গণমাধ্যম কাদের দ্বারা পরিচালিত হবে? যদি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যবসায়ীর হাতে গণমাধ্যম পরিচালিত হয় সেখানে স্বাধীনতা হবে সেই ধরনের। আবার মালিকানার ধরন যদি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় হয় সেই গণমাধ্যম হবে আরেক ধরনের। সরকারের পক্ষ থেকে যদি গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব হয় তা হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জীবনেও হবে না।
অনেক সময় রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে গণমাধ্যমে হয়রানি করা হয়। এই হয়রানির আবার রকমফের থাকে। তবে গণমাধ্যমের জন্য যদি নির্দিষ্ট একটি স্বাধীন কমিশন নিশ্চিত করা যায় তা হলে হয়তো স্বাধীনতা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তখন কিন্তু মানসম্মত গণমাধ্যম পাওয়া যাবে। যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
গণমাধ্যমের জন্য যে একটি কমিশন গঠন করা হবে, সেখানে যেন সব ধরনের গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে একটাই কমিশন হতে হবে। কমিশনের রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ অবশ্যই থাকবে। গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ যদি সরকারের হাতে এককভাবে থাকে, তা হলে স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
আমরা প্রায় সময় বলে থাকি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা। কিন্তু দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান বা গণতন্ত্র যদি শক্তিশালী না হয় তা হলে গণমাধ্যমের জন্য বিপদ আছে। আর গণতন্ত্রের দায়দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। অনেক সময় রাজনীতিবিদরা ভুল থেকে শিক্ষা নেন না। আর শিক্ষা নেন না বলেই বিপদে পড়েন।
এখন দেশে গণমাধ্যমের সয়লাব হয়ে গেছে। কিন্তু গুণগতমান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য আমাদের প্রয়োজন গণমাধ্যমের উৎকর্ষ সাধনের দিকে মনোযোগী হওয়া। তবে হ্যাঁ, গণমাধ্যমে এখন বৈচিত্র্যও এসেছে। বিশেষ করে অনলাইনের পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়ায়। তবে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়ার জন্য সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা। তবে একেবারেই যে বিশ্বাসযোগ্যাতা অর্জন করেনি,তা নয়। তবে নিত্যদিনের নতুন নতুন অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম
সময়ের আলো/আআ