এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ঢাকায় এসে নূরজাহান বেগম নারীদের ছবি আঁকতে ও লেখালেখি করতে উৎসাহ দিতেন। যেন এই মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। যারা লেখা পাঠাতেন তাদের ছবি ছাপতেন। তিনি নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস ও লেখালেখির বিকাশ ঘটানোর জন্য কাজ করতেন। ঢাকার পাড়ায়-মহল্লায় লেখিকা সংঘ গড়ে তুলেছিলেন। একসময় গড়ে ওঠে বেগম ক্লাব।
বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতায় পদচারণ শুরু হয় ব্রিটিশ আমল থেকেই। তখন নারী সাংবাদিকদের আসা শুরু হয় সাময়িকী সম্পাদনার মাধ্যমে। প্রথম সাময়িক পাক্ষিক ‘বঙ্গমহিলা’ সম্পাদনা করেছিলেন একজন নারী। আর প্রথম সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘বঙ্গবাসিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৮৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। এভাবে যাত্রা শুরু হয় নারী সাংবাদিকতার।
১৯৩৩ সালে বেগম শামসুন্নাহার ও মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বুলবুল’ নামে ম্যাগাজিন। তবে তৎকালীন পূর্ববাংলায় প্রথম যে সাময়িকী প্রকাশিত হয় তার নাম ছিল ‘বঙ্গনারী’। সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘বেগম’-এর প্রকাশনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই। বেগম পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। নূরজাহান বেগম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সম্পাদকের দায়িত্ব নেন।
নূরজাহান বেগমকে বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বলা হয়। তিনি তার বাবা সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের হাত ধরে এ পেশায় আসেন। সওগাতের অফিসটি ছিল কলকাতায়। এই অফিসে নিয়মিত সাহিত্য মজলিস হতো। সেখানে যোগ দিতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেনসহ আরও প্রখ্যাত অনেকে। এসব সাহিত্য মজলিসের নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন নূরজাহান বেগম। যে কারণে বলা যায় বাবার কাছেই পত্রিকার কাজে তার হাতেখড়ি। তিনি ভারত উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’-এর সূচনালগ্ন থেকেই সম্পাদনার কাজে সম্পৃক্ত হন। ছয় দশক ধরে বেগম পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।
এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ঢাকায় এসে নূরজাহান বেগম নারীদের ছবি আঁকতে ও লেখালেখি করতে উৎসাহ দিতেন। যেন এই মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। যারা লেখা পাঠাতেন তাদের ছবি ছাপতেন। তিনি নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস ও লেখালেখির বিকাশ ঘটানোর জন্য কাজ করতেন। ঢাকার পাড়ায়-মহল্লায় লেখিকা সংঘ গড়ে তুলেছিলেন। একসময় গড়ে ওঠে বেগম ক্লাব।
নূরজাহান বেগমের এই কার্যক্রম দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৪ সালে মার্কিন মহিলা সাংবাদিক আইদা আলসেথ ঢাকায় বেগম পত্রিকা অফিস পরিদর্শন করেন। এরপর বেগম পত্রিকায় আসেন চীনা লেখিকা মিস মেরিয়া ইয়নে।
ব্যাংককের শাস্ত্রীসারণ পত্রিকার সম্পাদক নিলওয়ান পিনতং। ১৯৫৫ সালে সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বেগম পত্রিকার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আসেন ইংরেজি সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক উইলিয়ামের স্ত্রী জ্যাক উইলিয়ামস। পর্যায়ক্রমে বেগম পত্রিকায় আসেন ইন্দোনেশিয়ার নেত্রী তিতি মোমেত তানু মিজাজা ও নয়া চীনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাডাম লি তে চোয়ান।
নূরজাহান সমাজের কুসংস্কার, অজ্ঞতার জগদ্দল পাথর সরিয়ে ‘বেগম’-এর মতো মুক্তচিন্তার পত্রিকা প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন। তিনি নিজে এতে লিখতেন। সম্পাদনা করতেন। প্রেসে বসে প্রুফও দেখতেন। ২০১৬ সালের এপ্রিলে পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৯৪৬ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরপরই বেগম পত্রিকার হাল ধরি। সে সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বেগমের প্রচ্ছদ হবে নারীদের নিয়ে। তবে প্রথমদিকে আমি ইংরেজি পত্রিকা থেকে বিভিন্ন প্রবন্ধ ও রান্নাবান্না বিষয়ক লেখার অনুবাদ করি।
সূচনালগ্নের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, সে সময় পারিবারিক কারণে মেয়েরা ঘরের বাইরে বের হতে পারত না। এরপরও লেখা জোগাড় করা ছিল আমার জন্য চ্যালেঞ্জের। মেয়েরা লিখবে, নাম প্রকাশ হবে, পুরুষরা দেখবে তা ছিল অনেক পরিবারের কাছে অপরাধ। কারণ এতে পরিবারের মান যাবে। আর মেয়েদের ছবি পত্রিকায় প্রকাশ হলে তো সর্বনাশ।
এরপরও পিছু হটেননি নূরজাহান। কারণ তিনি মনে করতেন বেগমের জন্ম নারীদের মুক্তির জন্য। নারীদের জাগরণের জন্য। বেগম ছিল এক নীরব বিপ্লব। নারী শিক্ষার পক্ষে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের বিরুদ্ধে। নূরজাহান বেগম বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, বক্তৃতা ও বিবৃতিতে সমাজের অন্ধকার দূর করে মেয়েদের এগিয়ে চলার মন্ত্র শুনিয়েছেন। ২০১৪ সালের ৪ জুন এক অনুষ্ঠানে নূরজাহান বেগম দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করেন, ‘মেয়েদের আর পেছনের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। পথ এখন প্রশস্ত। আপনারা এগিয়ে চলুন। পুরুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগিয়ে চলুন।’
নূরজাহান বেগম তিনি শুধু সাংবাদিক নারীদের পথ দেখাননি। তিনি বাংলাদেশে নারীদের জাগরণে বিশাল ভূমিকা রেখেছেন। পথ দেখিয়েছেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না বেগম পত্রিকাকে ঘিরে যেসব লেখিকা, সাংবাদিক খ্যাতিমান হয়ে উঠেন এর মধ্যে রয়েছেন- বেগম সুফিয়া কামাল, লায়লা সামাদ, জাহানারা আরজু, শামসুন্নাহার মাহমুদ, রাবেয়া খাতুন, মাফরুহা চৌধুরী, সাজেদা খাতুন প্রমুখ। আর নূরজাহানের অনুপ্রেরণায় যারা সংবাদপত্র জগতে আসেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- নাসিমা সুলতানা, মাহমুদা চৌধুরী, নাসিমুন আরা হক মিনু, মমতাজ বিলকিস, পারভীন সুলতানা ঝুমা, রাশেদা আমিন, কনিকা মাহফুজ, শাহিদা হোসেন প্রমুখ।
বেগম পত্রিকা ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। এরপর ঢাকা থেকে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ২০১৬ সালের ২৩ মে নূরজাহান বেগম শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেও প্রকাশনা বন্ধ হয়নি। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৫০০ কপি। আর তার মূল্য রাখা হয় চারআনা। প্রথম বেগম ঈদ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে। সেই সংখ্যার দাম রাখা হয়েছিল ২ টাকা।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সময়ের আলো
সময়েল আলো/আআ