মাইকেল ফ্যারাডে যদি আজকের বাংলাদেশে ফিরে আসতেন, তাকে হয়তো প্রথমেই একটি প্রশ্ন করা হতো -‘স্যার, আপনি বিদ্যুৎ আবিষ্কার করলেন কেন?’ প্রশ্ন শুনে ফ্যারাডে সম্ভবত অবাক হতেন। কারণ বিদ্যুৎ তিনি আবিষ্কার করেননি; বিদ্যুৎ ও তড়িৎ-চৌম্বকত্বের রহস্য উন্মোচনে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি এতটাই জটিল যে, এখানে বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার রহস্য! বিদ্যুৎ আছে— কিন্তু কখন থাকবে, সেটি নিশ্চিত নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে— কিন্তু সবসময় উৎপাদন করতে পারে না।
উৎপাদন সক্ষমতা আছে- কিন্তু জ্বালানি নেই। জ্বালানি আছে-কিন্তু সরবরাহে সমস্যা। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে— কিন্তু কোথাও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা। আর সবশেষে নাগরিকের ভাগ্যে জোটে একটি পরিচিত শব্দ— লোডশেডিং। লোডশেডিং যেন আমাদের জাতীয় জীবনের এমন এক অতিথি, যার আসার আগে কোনো নিমন্ত্রণপত্র লাগে না, যাওয়ার সময়ও বিদায় নেওয়ার সৌজন্যতা বোধ নেই!
গরমের রাতে যখন ফ্যান বন্ধ হয়ে যায়, তখন বোঝা যায় বিদ্যুৎ আধুনিক জীবনের কত বড় আশীর্বাদ। আর যখন মোবাইলের চার্জ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎও চলে যায়, তখন নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগে- আমরা কি ডিজিটাল বাংলাদেশে আছি, নাকি ডিজিটাল যুগের আগে কোনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে? ব্যঙ্গের বিষয় হলো, আমাদের জীবনে এখন প্রায় সবকিছুই ডিজিটাল।
অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স, অনলাইন ক্লাস, সরকারি সেবা, ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডেটা সেন্টার— সবকিছুর জন্য ইন্টারনেট দরকার। আর ইন্টারনেটের পেছনে যে বিদ্যুৎ লাগে, সেটি যেন আমাদের পরিকল্পনার শেষ পাতায় লেখা একটি ছোট্ট ফুটনোট! একজন ফ্রিল্যান্সার রাত জেগে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল। ল্যাপটপের ব্যাটারি কিছুক্ষণ বাঁচাবে, রাউটার হয়তো ইউপিএস-এ বাঁচবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ বাঁচবে তো? ক্লায়েন্ট তখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাস্তবতা বুঝবেন না; তিনি শুধু দেখবেন— ডেডলাইন মিসড।
একজন শিক্ষার্থী পড়তে বসেছে। একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একটি কারখানায় উৎপাদন চলছে। একটি সার্ভারে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে। একটি দোকানে ডিজিটাল পেমেন্টের অপেক্ষায় ক্রেতা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ নেই। একটি সুইচ বন্ধ হওয়া মানে যে কতগুলো কাজ একসঙ্গে থেমে যাওয়া— লোডশেডিং আমাদের সেটিই প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়। অথচ আমরা গর্ব করে বলি, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে।
অবশ্যই বেড়েছে- এটি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সক্ষমতা কত আর নির্ভরযোগ্য উৎপাদন কত? একটি গাড়ি গ্যারেজে দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিন শক্তিশালী, চাকা নতুন, গায়ে চকচকে রং। কিন্তু ট্যাঙ্কে জ্বালানি নেই। তাকে কি আমরা দীর্ঘপথ চলার সক্ষম গাড়ি বলব?
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হবে না; প্রয়োজনীয় সময়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি, কার্যকর সঞ্চালন ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। সাম্প্রতিক লোডশেডিং আমাদের সেই পুরোনো সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে— বিদ্যুৎ খাতকে শুধু উৎপাদনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না; দেখতে হবে পুরো ব্যবস্থাটিকে। গ্যাসের সংকট হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে। জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে গেলে সরবরাহ কমে। কোথাও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎও ভোক্তার কাছে পৌঁছতে পারে না। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাটি অনেকটা একটি চেইনের মতো। একটি জায়গায় দুর্বলতা তৈরি হলেই পুরো ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। আর এই চেইনের সবচেয়ে দুর্বল প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে সাধারণ মানুষ।
লোডশেডিংয়ের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। একটি শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ মানে শুধু কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিল বাঁচানো নয়; এর অর্থ শ্রমঘণ্টার অপচয়, উৎপাদন ক্ষতি, অর্ডার বিলম্ব, জেনারেটরের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় এবং কখনো কখনো যন্ত্রপাতির ক্ষতি। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কাছে কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং হয়তো মাসের লাভের একটি অংশ খেয়ে ফেলতে পারে। একজন কৃষকের কাছে বিদ্যুৎ না থাকা মানে সেচের অনিশ্চয়তা। একজন দোকানদারের কাছে এটি ব্যবসার ক্ষতি। আর সাধারণ পরিবারের কাছে— গরম, অস্বস্তি, পড়াশোনায় ব্যাঘাত এবং একরাশ বিরক্তি। তাহলে প্রশ্ন হলো, সমাধান কোথায়? শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো? নাকি আরও বিদ্যুৎ আমদানি করা? নাকি জ্বালানি আমদানি বাড়ানো? সমাধান সম্ভবত একটিতে নয়— সমন্বিত পরিকল্পনায়।
জ্বালানি উৎসকে বহুমুখী করতে হবে। গ্যাস, কয়লা, আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য শক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে শুধু সোলার প্যানেল বসিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব হবে না; প্রয়োজন স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে।
কোথায় কখন কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কোথায় চাহিদা বাড়ছে, কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে— এসব সিদ্ধান্ত রিয়েল-টাইম ডেটার ভিত্তিতে নেওয়ার সময় এখনই। বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতাও জরুরি। মানুষ জানতে চায়— বিদ্যুৎ কেন নেই? জ্বালানি
কোথায় সংকট? কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ? কত ঘাটতি? পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে? এসব তথ্য নিয়মিত ও সহজ ভাষায় প্রকাশ করা হলে অন্তত নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। কারণ মানুষ শুধু বিদ্যুৎ চায় না; মানুষ নিশ্চয়তা চায়।
একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আর শুধু বাতি জ্বালানোর বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, কৃষি এবং জাতীয় নিরাপত্তার অবকাঠামো। আগামী দিনের বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, অটোমেশন, রোবোটিকস ও ডিজিটাল সেবা যত বাড়বে, বিদ্যুতের প্রয়োজন তত বাড়বে। তখন কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং শুধু একটি বাসার ফ্যান বন্ধ করবে না; থামিয়ে দিতে পারে একটি পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের কার্যক্রম। তাই ফ্যারাডের বিদ্যুৎকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ফ্যারাডে তার কাজ করে গেছেন। বিজ্ঞানীরা তাদের কাজ করেছেন। প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েছেন। প্রযুক্তিবিদরা বিদ্যুৎনির্ভর পৃথিবী তৈরি করেছেন। এখন আমাদের কাজ হলো সেই পৃথিবীকে নির্ভরযোগ্য রাখা। নইলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক আশীর্বাদ আমাদের কাছে এক অদ্ভুত রসিকতায় পরিণত হবে— বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই!
আর লোডশেডিং? সে তো আমাদের জাতীয় জীবনের সেই খলনায়ক, যে পর্দায় খুব কম সময় দেখা দেয়, কিন্তু গল্পের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসে হাজির হয়। ফ্যারাডের বিদ্যুৎ তাই নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ। কিন্তু সেই আশীর্বাদ যদি বারবার অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্নটি ফ্যারাডেকে নয়, আমাদেরই করতে হবে— বিদ্যুৎকেন্দ্র আমরা বানিয়েছি, সক্ষমতা আমরা বাড়িয়েছি; কিন্তু নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিতে কি আমরা সত্যিই প্রস্তুত? কারণ নাগরিক আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের মেগাওয়াট গুনতে চায় না।
সে শুধু চায়— রাতে ফ্যান চলুক, শিশুর পড়ার টেবিলে আলো জ্বলুক, হাসপাতালে যন্ত্র সচল থাকুক, কারখানার চাকা ঘুরুক, ইন্টারনেট চালু থাকুক এবং তার জীবনটা যেন লোডশেডিংয়ের সূচির ওপর নির্ভর না করে।
ফ্যারাডে বিদ্যুতের পথ দেখিয়েছিলেন; এখন আমাদের দায়িত্ব— সেই আলো যেন মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পথটি অন্ধকার না হয়।
প্রকৌশলী
স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা