বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে; স্বাধীনতার পর কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে গেলেও কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং শহরমুখী জনসংখ্যার চাপ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তারা ঢাকাসহ বড় শহরে ছুটে যাচ্ছে- এর ফলে শহরে বস্তির বিস্তার, যানজট, পরিবেশদূষণ ও সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দর্শন হওয়া উচিত— স্থানীয় সম্পদ, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং স্থানীয় মানুষের দক্ষতাকে কেন্দ্র করে উপজেলাকেন্দ্রিক শিল্পায়ন। বিশেষ করে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি উপজেলায় শিল্প হাব গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটতে পারে।
জিআই পণ্য এমন একটি পণ্য, যার গুণগত মান, সুনাম বা বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশের জামদানি, রাজশাহীর সিল্ক, বগুড়ার দই, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, খুলনার চুইঝাল, বিজয়পুরের সাদামাটি, কুমিল্লার খাদি ও রসমালাইসহ অনেক পণ্য ইতিমধ্যে জি আই স্বীকৃতি পেয়েছে অথবা স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান ও রফতানি অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা এখনও সীমিত। বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প বা বিশেষ উৎপাদন দক্ষতা। কিন্তু এই সম্পদগুলোকে জাতীয় শিল্পনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি। ফলে কৃষক, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উৎপাদন করলেও প্রকৃত মূল্য সংযোজনের বড় অংশ চলে যায় সাপ্লাই চেইনের মধ্যস্বত্বভোগী বা শহরকেন্দ্রিক ব্যবসার হাতে, এমন বৈষম্য দূর করতে হলে প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় জি আই পণ্য বা সম্ভাবনাময় ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে কেন্দ্র করে সমন্বিত শিল্প হাব গড়ে তুলতে হবে।
একটি উপজেলা শিল্প হাব বলতে শুধু একটি কারখানাকে বোঝায় না- এটি হবে কাঁচামাল উৎপাদন, গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস, ডিজিটাল বিপণন, ই-কমার্স এবং রফতানি সুবিধার সমন্বিত কেন্দ্র। সেখানে থাকবে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সহজ ঋণ, পরীক্ষাগার এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ অর্থাৎ কাঁচামাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খল একটি উপজেলার মধ্যেই গড়ে উঠবে। বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, স্থানীয় পণ্যকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শিল্পায়ন তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। চীন তার গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশলে স্থানীয় শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ঞধড়নধড় ঠরষষধমব এবং ঙহব ঠরষষধমব, ঙহব চৎড়ফঁপঃ মডেলের মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রামকে বিশেষায়িত উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। কোনো গ্রাম আসবাবপত্র, কোনো গ্রাম পোশাক, কোনো গ্রাম কৃষিপণ্য, আবার কোনো গ্রাম হস্তশিল্প উৎপাদনে বিশেষায়িত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই পণ্য দেশ-বিদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ভিয়েতনামও একই পথে এগিয়েছে; তাদের ঙহব ঈড়সসঁহব, ঙহব চৎড়ফঁপঃ (ঙঈঙচ) কর্মসূচি আজ বিশ্বব্যাপী একটি সফল মডেল হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি কমিউনের বা অঞ্চলের নিজস্ব পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকার প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, ব্র্যান্ডিং এবং বাজার সংযোগে বিনিয়োগ করেছে। স্থানীয় কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য ও হস্তশিল্প এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে গ্রামীণ মানুষের আয় বেড়েছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভারতও জি আই পণ্যকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে; দার্জিলিং চা, বেনারসি শাড়ি, কাঞ্চিপুরম সিল্ক, কাশ্মিরি জাফরান, আলফোনসো আমসহ শত শত জিআই পণ্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার, সমবায় এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে উৎপাদকদের প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বিপণনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমন উদ্যোগের ফলে শুধু পণ্যের সুনামই বাড়েনি বরং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে; রাজশাহীর সিল্ককে কেন্দ্র করে টেক্সটাইল ও ফ্যাশন শিল্প, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে কেন্দ্র করে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প, দিনাজপুরের চালকে কেন্দ্র করে খাদ্যশিল্প, বগুড়ার দইকে কেন্দ্র করে দুগ্ধশিল্প, জামদানিকে কেন্দ্র করে ডিজাইন ও রফতানি শিল্প এবং খুলনার চুইঝালকে কেন্দ্র করে মসলা শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব— দীর্ঘ মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় একইভাবে প্রতিটি জেলার নিজস্ব সম্ভাবনাকে উপজেলাভিত্তিক শিল্প হাবে রূপ দেওয়া গেলে দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রই বদলে যাবে। ভবিষ্যতে উপজেলা ভিত্তিক শিল্প হাবগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো অত্যন্ত জরুরি হবে। প্রতিটি উৎপাদক, কৃষক ও কারিগরকে একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা থাকবে। প্রতিটি পণ্যের জন্য কিউআর কোড, ট্রেসেবিলিটি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল সার্টিফিকেশন চালু করতে হবে। এতে ভোক্তা সহজেই জানতে পারবেন পণ্যের উৎপত্তিস্থল, উৎপাদক এবং মানের তথ্য, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের জি আই পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।
স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প গড়ে উঠলে নারীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। অনেক নারী ঘরে বসেই খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, প্যাকেজিং, অনলাইন বিপণন কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারবেন। এতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন যেমন বাড়বে, তেমনি পারিবারিক আয়ও বৃদ্ধি পাবে- ভবিষ্যতের ডি সেন্ট্রালাইজড এমন শিল্পায়নের আরেকটি বড় সুফল হবে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন কিন্তু উপজেলা শিল্প হাব গড়ে উঠলে তারা স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডিজিটাল বিপণন ও রফতানিমুখী ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন। কর্মসংস্থান খোঁজার পরিবর্তে তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারীতে পরিণত হবেন। এখানে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে— ক্ষুদ্র উৎপাদকরা এককভাবে বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারেন না কিন্তু সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ করলে উৎপাদন খরচ কমবে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং রফতানির সুযোগও বাড়বে।
সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন, কৃষি বিপণন অধিদফতর, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দাতাসংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা অবশ্যই প্রয়োজন হবে। প্রতিটি উপজেলার সম্ভাবনাময় জিআই ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের তালিকা তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি সহজ ঋণ, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস, কোল্ড স্টোরেজ, মান পরীক্ষাগার এবং রফতানি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত— ‘এক উপজেলা, এক বিশেষায়িত শিল্প হাব’। প্রতিটি উপজেলায় একটি বা একাধিক বিশেষ পণ্যকে কেন্দ্র করে শিল্পায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। এতে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের মধ্যে একটি কার্যকর মূল্যশৃঙ্খল তৈরি হবে। স্থানীয় কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু ডিজিটাল সেবা দিয়ে পূরণ হবে না; প্রয়োজন স্মার্ট উৎপাদন ব্যবস্থা, স্মার্ট বাজারব্যবস্থা এবং স্মার্ট কর্মসংস্থান। জিআই পণ্যের ভিত্তিতে উপজেলাকেন্দ্রিক শিল্প হাব সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে। এটি শুধু শিল্পনীতি নয়; এটি হবে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি জাতীয় কর্মসূচি। আজ বর্তমান সরকার ও নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষের সময় ভিশনারী দৃষ্টিতে সময় এসেছে উন্নয়নের কেন্দ্রকে রাজধানী থেকে উপজেলা ও গ্রামে নিয়ে যাওয়ার। স্থানীয় সম্পদকে স্থানীয় মানুষের হাতেই মূল্য সংযোজনের সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো বাংলাদেশও যদি জি আই পণ্যের ওপর ভিত্তি করে উপজেলা কেন্দ্রিক শিল্প হাব গড়ে তুলতে পারে, তবে আগামী এক দশকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নীরব শিল্পবিপ্লব ঘটবে। তখন গ্রাম আর শুধু কৃষির জনপদ থাকবে না; গ্রাম হবে উৎপাদনের জনপদ, উদ্ভাবনের জনপদ, উদ্যোক্তার জনপদ এবং কর্মসংস্থানের জনপদ- আর সেই পথ ধরেই গড়ে উঠবে একটি আত্মনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
কৃষিবিদ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা