গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চা এক বিষয় নয়

ড. কানন পুরকায়স্থ

মতামত

খ্রিস্টপূর্ব ৫০৭ অব্দের দিকে প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘Demokratia’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে ‘democracy’বা গণতন্ত্র শব্দ, যেখানে ‘demos’- এর অর্থ জনগণ এবং

2026-08-15T08:26:12+00:00
2026-08-15T08:26:12+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
মতামত
ইউরোপের চিঠি
গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চা এক বিষয় নয়
ড. কানন পুরকায়স্থ
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
খ্রিস্টপূর্ব ৫০৭ অব্দের দিকে প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘Demokratia’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে ‘democracy’বা গণতন্ত্র শব্দ, যেখানে  ‘demos’- এর অর্থ জনগণ এবং  ‘kratos’-এর অর্থ ক্ষমতা বা শাসন। সুতরাং গণতন্ত্রের অর্থ হলো ‘জনগণের ক্ষমতা’। প্রাচীনকালে এটি ‘একজন ব্যক্তি, একটি ভোট’ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রাজনৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করত যে, ধনী ও অভিজাত শ্রেণি যেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।

একনায়কতন্ত্রের তুলনায় গণতন্ত্রের কিছু সুবিধা রয়েছে। গণতন্ত্র নিজের ভুলত্রুটি বা বাস্তবতাকে স্বীকার করতে পারে। অপরদিকে সত্যকে একনায়করা সহ্য করতে পারে না। এ কারণেই তারা মানুষকে এটা বিশ্বাস করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যে, গণতন্ত্র আমাদের দুর্বল করে দেয়।
 
তবে ইতিহাস বলে, কোনো সরকার যদি জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়- এমনকি তারা যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়ে থাকে তবু শেষ পর্যন্ত তাদের হয় ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়, নতুবা কঠোর আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়। মূল কথা হলো, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর যত্ন ও সুরক্ষা। গণতন্ত্র কেবল একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশাই জাগায় না, বরং জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফলাফলও বয়ে আনে।

গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণার একটি মূল ভিত্তি হলো স্বাধীনতা। তাই এথেন্সের নাগরিকরা একই বিষয়ে দুবার ভোট দিতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। এখানে আমি খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭ অব্দের একটি উদাহরণ দিতে পারি; সে সময় লেসবস দ্বীপের মাইটিলিন শহরটি তৎকালীন এথেনীয় সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করেছিল। এর প্রতিশোধ হিসেবে এথেন্সের অ্যাসেম্বলি সমবেত হয়ে শহরের সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে হত্যা এবং নারী ও শিশুদের দাস বানানোর পক্ষে ভোট দেয়। 

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা ভাবল, ‘হে ঈশ্বর, আমরা কী করেছি!’ তাই তারা আরেকটি সভা ডাকল এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আগের সিদ্ধান্তটি বাতিল করার পক্ষে ভোট দিল। ইতিহাস বলে, প্রথম সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার জন্য যে জাহাজটি পাঠানো হয়েছিল, সেটি ধীরগতিতে চলছিল। ফলে দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত বহনকারী জাহাজটি সহজেই সেটিকে অতিক্রম করে যায় এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়। সুতরাং মত পরিবর্তনের ওপর কোনো বিধিনিষেধ না থাকলে এবং দ্বিতীয়বার কী বিষয়ে ভোট দেওয়া হচ্ছে তা জানা থাকলে, দুবার ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখাটা একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে। কোনো দেশ যদি সংস্কারের জন্য গণভোটের আয়োজন করতে চায়, তবে ভোটারদের জানা উচিত এই সংস্কার তাদের জন্য কী অর্থ বহন করে। এ বিষয়ে কোনো লুকোচুরি বা অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়।


কানাডার লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড তার ‘গণতন্ত্র’ প্রবন্ধে আমাদের একটি বৃত্ত কল্পনা করতে বলেছেন। এই বৃত্তের শীর্ষে রয়েছে সর্বগ্রাসী শাসন, আর নিচে রয়েছে বিশৃঙ্খলা। স্বৈরাচারী শাসনে একনায়করা রাজত্ব করে এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যেই দল, জনতা ও একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিস্তার লাভ করে। বৃত্তের মাঝের অংশটিকে আমরা সহনীয় অঞ্চল বলতে পারি। এই অঞ্চলের মানুষ এই ধারণাকে সম্মান করে যে, প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর আরোপ করা যাবে না, শাসকদের আইনের শাসনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং বিচার বিভাগও কোনো একনায়কের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত নয়। এ ছাড়া ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিতর্কের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার মতো ব্যক্তিগত অধিকার সমুন্নত রাখা উচিত। সহনীয় অঞ্চল থেকে এমন সম্ভাবনা থাকে যে, কিছু রাজনৈতিক ডানপন্থি ও বামপন্থি সর্বগ্রাসী শাসনের সঙ্গে যুক্ত। আবার রাজনৈতিক ডানপন্থি ও বামপন্থিদের পক্ষ থেকেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে। 

অ্যাটউডের মতে, ‘নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট করুন, নিজেকে একটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ফেলুন এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন প্রত্যক্ষ করুন, যা সবকিছু সচল রাখে- যেমন সরবরাহ ব্যবস্থা, কর বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং এর ফল হবে চরম বিশৃঙ্খলা।’ 

ইতিহাস দেখেছে যে বিশৃঙ্খলার মধ্যে কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই আর কাজ করে না এবং এই ধরনের পরিস্থিতিই প্রাচীন রোমে জুলিয়াস সিজারকে একনায়ক হিসেবে নিয়োগের দিকে পরিচালিত করেছিল। যারা যথাসময়ে একনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়, তারা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থামাতে পারলেও তা না করে বলবে, ‘সবকিছু পুড়িয়ে দাও, সব ভবন ধ্বংস করে দাও এবং একমাত্র আমিই এটি ঠিক করতে পারি।’ 

আমরা এও লক্ষ করি যে হিটলার নির্বাচিত হয়েও শেষ পর্যন্ত একনায়ক হয়েছিলেন, অথবা সোভিয়েত ইউনিয়ন গোষ্ঠীভিত্তিক সাম্যবাদ দিয়ে শুরু হলেও স্তালিনের একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটেছিল।

নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের মানুষের জন্য গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি আফগানিস্তানের মতো কিছু দেশে গণতন্ত্র কেন ব্যর্থ হয়েছে, সে বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে। যেকোনো শাসনব্যবস্থা, তা গণতান্ত্রিক হোক বা স্বৈরাচারী, তাকে অবশ্যই তার শাসিত সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। জাতিসংঘে নিযুক্ত একজন আফগান রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেছেন যে, ‘তালেবানের অধীনে সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় স্বৈরাচারে রূপান্তর এবং এর ফলস্বরূপ আফগান জনগণ, বিশেষ করে নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতার ব্যাপক অবক্ষয়, এমন একটি কাঠামোর পরিণতিকে তুলে ধরে যার কোনো সমর্থন নেই এবং যা জনগণের আকাক্সক্ষাকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থÑ যা সর্বদা ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়।’
 
প্রকৃতপক্ষে আফগানিস্তানে নারী ও যুবসমাজই হলো দুটি বৃহত্তম জনগোষ্ঠী, যেখানে জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ যুবসমাজ এবং প্রায় ৫০ শতাংশ নারী। তাদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের অভাব যেকোনো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর পতনের কারণ হতে পারে।

সুতরাং গণতন্ত্র কোনো সরল বিষয় নয়। ভোট দেওয়ার ক্ষমতা সবসময় গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা নয়। ভোটকে অবশ্যই প্রতিনিধিত্বমূলক হতে হবে। অ্যাটউড মনে করেন যে, একটি নির্বাচন একটি প্রহসনমূলক প্রক্রিয়া হতে পারে, যা এমন ব্যক্তিদের দ্বারা আয়োজিত হয় যারা মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতিগুলোকে উৎখাত করেছে অথবা স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতা চাইছে। এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, দরজা, গেট বা ঢাকনা খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময় যে সচল সংযোগ বা ব্যবস্থার ওপর ভর করে চলে অথবা যা সংযুক্ত বস্তুগুলোকে যুক্ত করে, তা-ও সচল সংযোগ বা ব্যবস্থার মতোই। গণতন্ত্রও ঠিক এমনই।

বাংলাদেশ বা অন্য যেকোনো দেশের শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব নির্ভর করে এর সত্যতা, অন্তর্ভুক্তিমূলকতা এবং জনগণের চাহিদা ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর, যা একটি সচল সংযোগ বা ব্যবস্থার মতোই। প্রকৃত সামাজিক উদ্দেশ্য এবং জনগণের মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ছাড়া কোনো শাসন কাঠামোই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না, বিশেষ করে যদি তা বাইরে থেকে বা বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়। গণতন্ত্রকে কোনো প্রচার, ভোট বা বিজয় ভাষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। একে সহজলভ্য বলেও ধরে নেওয়া যায় না। ভোটারদের আস্থা বজায় রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে এর গুণাবলী সম্পর্কে বোঝাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লালন করার পাশাপাশি সংস্কারও করা প্রয়োজন। আমাদের এমন নেতা প্রয়োজন, যার সাহসী সিদ্ধান্ত, অলীক কল্পনা নয়, গণতন্ত্র গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। সব প্রতিপক্ষ আমাদের গণতন্ত্রের বিভেদকে কাজে লাগাতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে। তাই আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

সংক্ষেপে আমাদের মনে রাখতে হবে যে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি উদ্ভাবন করা, যা এথেনীয়রা অবশ্যই করেছিল এবং গণতান্ত্রিক চর্চা উদ্ভাবন করা, যা তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই করেনি, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে গণতান্ত্রিক চর্চাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন, যা কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করে বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ভোট প্রদানে বাধা দিয়ে অর্জন করা যায় না, বরং অন্তর্ভুক্তিকরণ ও সংহতির মাধ্যমে সম্ভব। আর এই প্রচেষ্টায় যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তাদের কেবল দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না, বরং গণতন্ত্রের ধারণা ও চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীও হতে হবে।


প্রাবন্ধিক ও গবেষক, যুক্তরাজ্য
মতামত লেখকের নিজস্ব


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে


  বিষয়:   গণতন্ত্র  চর্চা  মতামত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: