রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপি তার সংসদীয় কণ্ঠে নয়, নির্বাচকমণ্ডলীর কণ্ঠে ভোট দেন। তিনি সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না; তিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। তার ভোটের সাংবিধানিক উৎস সংসদের কার্যপ্রণালি নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপি যখন ভোট দেন, তখন তিনি কি সংসদ সদস্য হিসেবে ভোট দেন, নাকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে- সেই ভোটের ওপর ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য কি না,
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে শুধু ৭০ অনুচ্ছেদ দেখলে হবে না। ৭০, ৭২, ৭৫ ও ১৫২ অনুচ্ছেদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালির সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো একসঙ্গে দেখতে হবে। কারণ একজন সংসদ সদস্য ভোট দিলেই সেই ভোট সংসদীয় ভোট হয়ে যায় না; তার প্রতিটি ভোটও সংসদের কোনো সিদ্ধান্তের ওপর দেওয়া ভোট নয়।
বরং ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষাই এর প্রাথমিক সীমারেখা নির্ধারণ করে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য যদি ‘votes in Parliament against that party’ অর্থাৎ ‘সংসদে’ সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তা হলেই তার আসন শূন্য হবে। অর্থাৎ ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- ভোটটি হতে হবে এবং সেই ভোট হতে হবে দলের বিরুদ্ধে। এখানেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটের স্বাতন্ত্র্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য কোনো বিল, প্রস্তাব, আস্থাভোট, অনাস্থা প্রস্তাব কিংবা সংসদের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন না। তিনি সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন না। তিনি তখন সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলীর একজন সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তিকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার জন্য তার স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
অর্থাৎ একই ব্যক্তি একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হতে পারেন; কিন্তু এই দুই সাংবিধানিক পরিচয় থেকে উদ্ভূত তার ক্ষমতার প্রকৃতি এক নয়। সংসদে তিনি আইনসভার সদস্য হিসেবে ভোট দেন; রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে ভোট দেন। ভোটদাতা একই ব্যক্তি হওয়ায় তার প্রদত্ত দুই ধরনের ভোটের সাংবিধানিক চরিত্র এক হয়ে যায় না।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যের দলীয় আনুগত্যকে ‘সংসদে’ প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে। অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যের প্রতিটি সাংবিধানিক ভোটাধিকারকে দলীয় নির্দেশের অধীন করেনি। বরং এর নির্দিষ্ট ভাষা হলো- দলের বিরুদ্ধে ‘votes in Parliament’। ফলে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের আগে প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে- প্রশ্নবিদ্ধ ভোটটি আদৌ ‘রহ চধৎষরধসবহঃ’ প্রদত্ত ভোট কি না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটের ক্ষেত্রে উত্তরটি নেতিবাচক।
সংসদীয় কার্যপ্রণালিতে কোনো প্রশ্ন সংসদের সামনে আসে এবং সেই প্রশ্নের ওপর সংসদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংসদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী স্পিকার সেই প্রশ্ন সংসদের সামনে উপস্থাপন করেন এবং প্রয়োজনে ভোট বা Division-এর মাধ্যমে সংসদের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট কোনো parliamentary question-এর ওপর ভোট নয়। এটি সংসদের কোনো প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের প্রক্রিয়াও নয়; এটি নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক ভিত্তিও সংসদীয় কার্যপ্রণালির বাইরে একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনি কাঠামো সৃষ্টি করেছে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলীর কথা বলে; আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ সেই নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে।
অতএব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটের উৎস সংসদের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালি নয়; এর উৎস রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পর্কিত সাংবিধানিক ও আইনগত ব্যবস্থা।
এখানে আরেকটি মৌলিক বিষয় বিবেচ্য। সংসদের অধিবেশন চলমান থাকলেই কি সংসদ সদস্যের প্রত্যেক ভোট ‘সংসদে প্রদত্ত ভোট’ হয়ে যায়? অবশ্যই নয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটে সংসদ কোনো আইন প্রণয়ন করে না, কোনো সংসদীয় প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে না এবং কোনো সংসদীয় সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে না। ভোটের ফল সংসদের সিদ্ধান্তে পরিণত হয় না; বরং একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হন।
সুতরাং শুধু ভোটদাতা একজন সংসদ সদস্য- এই কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটকে ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে ‘াড়ঃবং রহ চধৎষরধসবহঃ’ বলা যায় না।
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরও স্পষ্ট। ওই দিন রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের অধীনে জাতীয় সংসদের কোনো অধিবেশন আহ্বান করেননি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংসদের অধিবেশন ডাকারও প্রয়োজন হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর অধীনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে আহ্বান করেন। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে ২৭ আগস্ট।
অতএব ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সংসদের কোনো অধিবেশনীয় কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করার সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। এটি সংসদের কার্যক্রম নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন, যেখানে সংসদ সদস্যরা নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে ভোটার। সংবিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নিজেই একটি স্বতন্ত্র নির্বাচকমণ্ডলী ও পৃথক নির্বাচনি ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে।
ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটকে সংসদীয় ভোটের সঙ্গে একীভূত করার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
বরং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্য তার দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য কোনো প্রার্থীকে ভোট দিলে, সেটিকে সরাসরি ‘দলের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট’ বলা ৭০ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক পরিভাষার যথার্থ প্রয়োগ নয়। তিনি তখন সংসদের ভেতরে দলের বিরুদ্ধে কোনো সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন না; তিনি নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন থাকতে পারে; কিন্তু নির্বাচনের সাংবিধানিক বিষয়বস্তু কোনো রাজনৈতিক দল নয়- রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি। এই ভোটের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না; ভোটের প্রত্যক্ষ বিষয় হলো- কে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হবেন।
অতএব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটকে ‘দলের পক্ষে’ বা ‘দলের বিপক্ষে’ সংসদীয় ভোট হিসেবে অভিহিত করা সাংবিধানিকভাবে যথার্থ নয়। কারণ দলীয় আনুগত্যের প্রশ্নটি ৭০ অনুচ্ছেদে যে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটে এসেছে, সেটি হলো- ‘votes in Parliament against that party’।
এই নীতির আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আনা হলে অনুচ্ছেদটির ভাষায় অনুপস্থিত একটি বিস্তৃতি আরোপ করা হয়। অর্থাৎ ‘votes in Parliament’-এর অর্থকে এমনভাবে সম্প্রসারিত করা হয়, যাতে সংসদের বাইরে, পৃথক সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রদত্ত ভোটও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অথচ সংবিধান নিজেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য একটি পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী এবং পৃথক নির্বাচন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। এখানে একটি মৌলিক সাংবিধানিক নীতিও প্রযোজ্য- একটি বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতাকে অন্য একটি সাংবিধানিক ক্ষমতার অধীন করে দেওয়া যায় না, যদি সংবিধান নিজে তা না করে।
৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যের দলীয় আনুগত্যের একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা। ৭০ অনুচ্ছেদের পরিধি নির্ধারিত হয়েছে ‘সংসদে’ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পরিধির বাইরে একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ক্ষেত্র।
অন্যথায় ৭০ অনুচ্ছেদকে এমন একটি সর্বগ্রাসী বিধানে পরিণত করতে হবে, যার ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তির ওপর অর্পিত প্রতিটি সাংবিধানিক ক্ষমতা, তিনি যে ক্ষমতাই প্রয়োগ করুন না কেন-দলীয় সিদ্ধান্তের অধীন হয়ে পড়বে। সংবিধানের ভাষা এমন সর্বব্যাপী ক্ষমতা ৭০ অনুচ্ছেদকে দেয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এই সীমারেখাটিই স্পষ্ট করে দেয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপি তার সংসদীয় কণ্ঠে নয়, নির্বাচকমণ্ডলীর কণ্ঠে ভোট দেন। তিনি সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না; তিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। তার ভোটের সাংবিধানিক উৎস সংসদের কার্যপ্রণালি নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাই দলীয় আনুগত্যের প্রশ্নটি মুখ্য নয়; মুখ্য হলো- প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার দায়িত্ব। এই নির্বাচনে সংসদ সদস্য তার দলীয় পরিচয়ে নয়, নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তার স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তিনি সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না; তিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। অতএব, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের ভোটকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে ‘সংসদে প্রদত্ত ভোট’ বলা যায় না। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার ভোটের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নেই।
লেখক : গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব