আমরা এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে অর্থনৈতিক সূচক বা অবকাঠামোগত উন্নতির চিত্র দৃশ্যমান হলেও সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতির চিত্রটি অত্যন্ত মলিন। চারপাশে তাকালে অন্যায়, অবিচার, মিথ্যাচার, দুর্নীতি আর অপরাধপ্রবণতার যে ছায়া দেখা যায় তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের নগ্ন প্রকাশ।
যখন সমাজে একজন মানুষ অন্য মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতে ভয় পায়, যখন সত্যের চেয়ে স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে সমাজব্যাধি তার শিকড়ে পৌঁছে গেছে। এই অবক্ষয়মান অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় মানুষের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলা। বিবেক হলো ভেতরের সেই নৈতিক কম্পাস, যা ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্দেশ করে। সমাজকে সম্পূর্ণ ধসে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আজ তীব্র আত্মসমালোচনার সময় এসেছে।
সাম্প্রতিক অপরাধ ও অনৈতিকতার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালেই দেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন এবং বছরে প্রায় ১২,৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হচ্ছে।
এর পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ও সাইবার অপরাধের বিস্তারও উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রীয় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর ভেতরকার চিত্র আরও ভয়াবহ- যেখানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ শিশুকে রাখা হচ্ছে এবং তাদের নিয়মিত সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে । এসব উপাত্ত ও পরিসংখ্যান কেবল অপরাধের খতিয়ান নয়, বরং আমাদের সামষ্টিক ও গভীর নৈতিক দেউলিয়াত্বেরই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
একবিংশ শতাব্দীর এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও এর অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার মূল্যবোধের ধসকে ত্বরান্বিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, গুজব রটানো, সাইবার বুলিং এবং অন্যের চরিত্র হননের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে পর্নোগ্রাফি ও সহিংস কনটেন্টের সহজলভ্যতা শিশু এবং তরুণদের মনস্তত্ত্বে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্ক্রিনটাইম যত বাড়ছে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি, সহনশীলতা ও প্রত্যক্ষ সামাজিক যোগাযোগের পরিধি তত সংকুচিত হচ্ছে। ভার্চুয়াল জীবনের সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ মোহে মানুষ বাস্তব জীবনের মৌলিক নৈতিকতা ও মানবিকতা হারিয়ে ফেলছে, যা একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য চরম হুমকি।
শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড, কিন্তু সেই শিক্ষা যদি কেবল সনদ অর্জনের গোলকধাঁধায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সমাজকে আলোকিত করতে পারে না। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ-৫ এবং ভালো ফলাফলের ওপর যে তীব্র ও অন্ধ প্রতিযোগিতা দেখা যায়, সেখানে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার স্থান অনেকটাই গৌণ। পাঠ্যপুস্তকে পুথিগত বিদ্যার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হলেও সততা, সহনশীলতা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধের মতো জীবনের মৌলিক পাঠগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তদুপরি, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা এবং লাগামহীন কোচিং বাণিজ্যের ভিড়ে শিক্ষার্থীরা আদব-কায়দা, পরমতসহিষ্ণুতা ও বড়দের শ্রদ্ধা করার মতো বুনিয়াদি আচার-ব্যবহার শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত সনদধারী তৈরি হলেও, সমাজে সৎ, দায়িত্বশীল ও বিবেকবান নাগরিকের তীব্র সংকট থেকেই যাচ্ছে।
একটি শিশুর নৈতিকতার বুনিয়াদ গড়ে উঠে তার পরিবার থেকে। অতীতে যৌথ পরিবারগুলোতে প্রবীণদের কাছ থেকে নীতিগল্প ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখার যে আবহ ছিল, একক পরিবারের প্রসারের ফলে তা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিক জীবনের নির্মম ব্যস্ততায় বাবা-মা অনেক সময়ই সন্তানকে পর্যাপ্ত গুণগত সময় (কোয়ালিটি টাইম) দিতে পারছেন না; তার বদলে এক ধরনের অপরাধবোধ থেকে শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্মার্টফোন বা ডিজিটাল গেজেট। অন্যদিকে আমাদের সামাজিক বন্ধনগুলোও দিন দিন শিথিল হয়ে পড়ছে।
অতীতে পাড়া-মহল্লায় বয়স্করা তরুণদের ভুলত্রুটি শুধরে দেওয়ার সামাজিক অধিকার ও দায়বদ্ধতা রাখতেন; অথচ আজ সমাজে ‘আমার কী’ কিংবা আত্মকেন্দ্রিক উদাসীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। পারিবারিক ও সামাজিক এই যৌথ নজরদারির অভাবই মূলত তরুণদের নৈতিকভাবে পথভ্রষ্ট হওয়ার পথ সুগম করে দিচ্ছে।
যেকোনো দেশের সমাজব্যবস্থাকে সুসংহত রাখার ক্ষেত্রে রাজনীতি ও অর্থনীতি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু যখন রাজনীতির মূল দর্শন জনকল্যাণ থেকে চ্যুত হয়ে কেবল ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সমাজে অনৈতিকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া এবং পেশিশক্তির নগ্ন প্রদর্শনী দেখে সাধারণ মানুষ আইনের শাসনের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে।
একইভাবে অর্থনীতিতে কালো টাকার দাপট, লাগামহীন ব্যাংক ঋণখেলাপি, আর্থিক জালিয়াতি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যের অসাধু কারসাজি সমাজকে এক মারাত্মক বার্তা দেয়- তা হলো, সৎপথে চলা বোকামি এবং অল্প পরিশ্রমে অবৈধভাবে ধনী হওয়াই চরম সার্থকতা। যখন সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষ সমাজে প্রতিনিয়ত কোণঠাসা ও অবহেলিত হয় এবং অসাধু ব্যক্তিরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে সমাজের সম্মানিত আসন লুফে নেয়, তখন মূল্যবোধের অবক্ষয় কেবল ব্যক্তিক থাকে না, তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো- সমাজে বিদ্যমান চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সীমাহীন ভোগবাদী মানসিকতা। যখন নীতি-নৈতিকতার চেয়ে কেবল বৈষয়িক বা অর্থনৈতিক সাফল্যকে সমাজে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন মানুষ যেকোনো উপায়ে অর্থ উপার্জনের অন্ধ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।
দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক অস্থিরতা, লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আয়ের পাহাড়সম অসমতা অনেককে অসদুপায় অবলম্বনে প্ররোচিত করছে। এর সমান্তরালে, নীতিহীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন- ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থ পাচার ও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন আজ চরমভাবে বিপন্ন। ফলশ্রুতিতে, সমাজে ‘টাকাই সব’ এবং ‘অর্থই পরম সুখ’- এমন এক চরম অনৈতিক ও ক্ষতিকর ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটছে, যা পুরো সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে কুরে খাচ্ছে।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো সমাজেই নৈতিকতার ভিত টিকে থাকতে পারে না। আমাদের সমাজে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম বড় অনুঘটক হলো- আইনের ধীরগতি এবং আইনি প্রয়োগের চরম অসমতা। বহু গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, আইনি ফাঁকফোকর কিংবা প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি একদিকে অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী ও বেপরোয়া করে তোলে, অন্যদিকে ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের মনে চরম হতাশার জন্ম দেয়। যখন নাগরিক সমাজ প্রত্যক্ষ করে যে প্রকাশ্য অন্যায়েরও যথাযোগ্য ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা বাড়ে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়। তাই একটি বিবেকবান ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য আইনের নিরপেক্ষ, কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
এই গভীর সামাজিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি সার্বিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। বিবেককে জাগিয়ে তোলার জন্য কেবল মুখের কথাই যথেষ্ট নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে । প্রথমত পরিবারকে সংস্কার করতে হবে- সন্তানকে সময় দিতে হবে, তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে এবং নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সততা ও সুশিক্ষার উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর আনতে হবে- কেবল ফলকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে নীতিশাস্ত্র, সামাজিক মূল্যবোধ ও খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।
তৃতীয়ত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে- এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক ক্লাব, পাঠাগার ও ক্রীড়া সংগঠন পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যেন তরুণরা ইতিবাচক কাজে যুক্ত থাকে।
চতুর্থত প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং তরুণদের বাস্তবমুখী সমাজসেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
পঞ্চমত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে- অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি মূল্যবোধের অবক্ষয় রাতারাতি ঘটেনি, তাই এর সমাধানও এক দিনে সম্ভব নয়। তবে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোনো জাতির শ্রেষ্ঠত্ব মাপা যায় না; আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার নৈতিকতায়। বস্তুগত সব অর্জন সত্ত্বেও বিবেকহীন সমাজ একসময় ধসে পড়তে বাধ্য। তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনা করার এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। আমাদের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নিশ্চিত করতে। আজই আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবেÑ তা না হলে এই অবক্ষয়ের আবর্ত থেকে মুক্তি মিলবে না।
প্রভাষক, অর্থনীতি জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে