কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকের অন্যতম নির্ভরতা বালাইনাশক, প্লান্ট গ্রোথ রেগুলেটর (পিজিআর) ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান। বাজারে থাকা এসব পণ্যের একটি বড় অংশের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরীক্ষাগারে পিজিআরের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এর অধিকাংশই ভেজাল। কৃষি উপকরণের লেবেলে যে উপাদানের নাম ও মাত্রা লেখা, ভেতরে তার অস্তিত্বই নেই। আর অস্তিত্ব যদি মেলেও তার পরিমাণ অতি সামান্য। এর ফলে কৃষক তো প্রতারিত হচ্ছেনই; ফসল, মাটি, পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ছে।
প্রতিষ্ঠিত বড় অনেক প্রতিষ্ঠানের পণ্যে নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক কম সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে। গতকাল সময়ের আলোয় প্রকাশিত ‘বিষেও নেই বিষ’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই তথ্য। কোনো কোনো পণ্যের নমুনায় সক্রিয় রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি এত কম যে তা পণ্যের ঘোষিত কার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সরকারি পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একাধিক প্রতিষ্ঠানের পণ্যে একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়লে সেটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ থাকে না। দেশে কীটনাশকের প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। কীটনাশক আমদানি, ল্যাব পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের অনুমোদনের যে বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
কীটনাশক ও পিজিআরের মতো কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী, হাজারো রাসায়নিকের পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। তবে পরীক্ষাগার সীমিত। পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কোনো কোনোটা কখনো বিকল হলে সেটার সমাধান সহজে মেলে না। নিয়ন্ত্রকব্যবস্থার সক্ষমতা ও বাজারের পরিধির মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে কাগজেকলমে পণ্য পরীক্ষা ও অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্যের ক্ষতি বহুমাত্রিক। কৃষক কাক্সিক্ষত ফলন পান না, তার টাকাও গচ্চা যায়। অকার্যকর রাসায়নিক ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়ে।
কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত এবং মাঠে ব্যবহারের বিভিন্ন স্তরে কঠোর নজরদারি থাকা দরকার। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভেজালের অভিযোগ উঠলে তা আমলে নিতে হবে। সুষ্ঠু তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া চলবে না। আইন সবার জন্য সমান।
নমুনা পরীক্ষায় যেসব পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেছে সেগুলো দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। কৃষক যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কৃষি রাসায়নিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিদ্যমান যন্ত্রপাতির পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবল বাড়াতে হবে।
পণ্যের লাইসেন্স ও আমদানির তথ্য, নমুনা পরীক্ষার ফল, অনুমোদিত সক্রিয় উপাদানের মাত্রাসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল ডাটাবেসে প্রকাশ করা যেতে পারে। তা হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সহজেই পণ্যের গুণমান যাচাই করতে পারবেন। পাশাপাশি কৃষকদের আসল ও অনুমোদিত পণ্য শনাক্ত করার বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, ফলন বাড়ানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে। যদি ভেজাল কৃষি রাসায়নিকের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হলে রাষ্ট্রের বড় একটি উদ্যোগ হোঁচট খায়। কাজেই কৃষকের হাতে ভেজালমুক্ত কৃষি উপকরণ পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। কৃষক যে পণ্য কিনছেন, তার লেবেলে লেখা উপাদান সত্যিই আছে কি না, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে