তারেক রহমানের উদ্যোগ : জনমনে আশার সঞ্চার

ব্রিগে. জেনা. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)

মতামত

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ

2026-08-19T05:16:12+00:00
2026-08-19T05:16:12+00:00
 
  বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
মতামত
তারেক রহমানের উদ্যোগ : জনমনে আশার সঞ্চার
ব্রিগে. জেনা. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকার সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, ক্রীড়া, অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং পররাষ্ট্রনীতিতে একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা দেশব্যাপী আলোচনা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতি অঙ্গীকার। সরকার প্রথমেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়। বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তা কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনে সুবিধাভোগীদের কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে দুর্নীতি, অপচয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে আসবে। 

পরিবার গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। যা একজন নারীকে তার পরিবারসহ দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি ও স্বাবলম্বী হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। এই বিশেষ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে শক্তিশালী করে।

শিক্ষা খাতে সরকার যুগোপযোগী সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক (ঝঞঊগ) শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের উন্নয়ন এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে শিক্ষাকে কর্মমুখী ও ভবিষ্যৎমুখী করার চেষ্টা করা হয়। 

সরকারের এই পদক্ষেপগুলো দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করার একটি সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইউনিফর্ম প্রদান, পুনঃভর্তি ফি বাতিল করা, শিক্ষাবৃত্তি দ্বিগুণ করা এবং ঘাটতি পূরণে নয় হাজার শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। 

অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে সরকারের আরেকটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাসের মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছে। আইসিটি খাতে দশ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগসহ শিল্পের বহুমুখীকরণ, রফতানি সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে গৃহীত এসব উদ্যোগ দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ছিল সরকারের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের অভাব এবং আর্থিক অনিয়মের কারণে এই খাত জনআস্থার সংকটে ভুগছিল। সরকার ব্যাংক পুনর্গঠন কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ফলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হয়। তবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।

সরকারের শিল্পনীতির লক্ষ্য হচ্ছে ‘মেইক ইন বাংলাদেশ’ ধারণার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও রফতানি বহুমুখীকরণ। বন্ধ রাষ্ট্রীয় কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পাট শিল্প, চিনি শিল্প এবং রেশম শিল্পে। অব্যবহৃত অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড, বিসিক শিল্প এলাকা, হাইটেক পার্ক এবং শিল্প ক্লাস্টার পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘কৃষক কার্ড’ সরকারের অন্যতম বড় কৃষি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে কৃষকের ডিজিটাল পরিচয় তৈরি, ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো, সার ও বীজ সহায়তা, কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ, স্বল্প সুদের ঋণ, ফসল বীমা, আবহাওয়া তথ্য, বাজারদর সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষিতে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো কৃষককে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনা এবং কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করা।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্রীড়াকে শুধু বিনোদন নয়, জাতি গঠন ও যুব উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছে। স্কুল পর্যায়ে চতুর্থ শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমের অংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, কারাতে, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ৬৪ জেলায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে। শতাধিক ক্রীড়াবিদকে ইতিমধ্যে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি পুনরায় চালু করা হয়েছে। এতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতিতে তারেক রহমানের সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবধর্মী কৌশল অনুসরণ করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা হয়। 

অর্থনৈতিক কূটনীতি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনো নির্দিষ্ট শক্তি বলয়ের সঙ্গে একচেটিয়া সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ আগের মতো কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হবে না বলে ইতিমধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

নীতিগত পদক্ষেপের পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বের ধরনও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি আধুনিক ও সংস্কারমুখী চিত্র জনমনে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।


তারেক রহমানকে ‘নতুন ধারার পথপ্রদর্শক’ বলার কারণ শুধু সংস্কারের ঘোষণা নয়; বরং সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও পররাষ্ট্রনীতিকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের মধ্যে যুক্ত করার প্রচেষ্টা। মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাকে একই উন্নয়ন-দর্শনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। অবশ্যই চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। উচ্চাভিলাষী সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যাগুলো সরকারের জন্য পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে থাকবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। নতুন ধারণা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ভবিষ্যৎমুখী উন্নয়ন দর্শনের মাধ্যমে তারেক রহমান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা নির্ভর করবে তার নীতিমালার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর। তবে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা যায়, প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে অতিক্রম করে নতুন পথের সন্ধান এবং সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি ইতিমধ্যেই একজন ‘নতুন ধারার পথপ্রদর্শক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

ডিরেক্টর জেনারেল, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   তারেক রহমান  উদ্যোগ  জনমন  আশা  সঞ্চার 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: