রাতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে ঢাকায় আছি। কথাটি নিছক রসিকতা নয়, ঢাকার নাগরিক জীবনের এক দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের সংক্ষিপ্ত চিত্র। প্রতি বছর বিশ্ব মশা দিবস আসে, সচেতনতার কথা বলা হয়, মশা নিয়ন্ত্রণে নানা কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। বাস্তবে দিবস চলে যায়, মশা থেকে যায়।
দেশে মশার বিস্তার ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরেই ২০ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ৭৬ জনের। শুধু ঢাকা নয়, খুলনা, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে।
খুলনায় ১ হাজার ৬শর বেশি মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে এই রোগে মারা গেছেন ১৪ জন। চট্টগ্রামে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৯১ জন। পিরোজপুরে ১ হাজার ২শর বেশি, ময়মনসিংহে ৯২৪ এবং গাজীপুরে ৭২০ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। একসময় বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল। কিন্তু এখন একে আর কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক বা মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাক্সিক্ষত ফল মিলছে না। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে খরচ করেছে ৬০৫ কোটি টাকা। এরপরও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। যে কারণে অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতি, পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলে হটস্পট চিহ্নিত করে অভিযান চালানো হয়, ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হলে ফগিং করা হয়। মশা নিধনে এ ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। রোগী বাড়বে তারপর অভিযান শুরু হবে— এমন নীতি থেকে সরে আসতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাবের আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, অনেক মশা এখন ওষুধপ্রতিরোধী হয়ে উঠছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় ও চট্টগ্রামে পরীক্ষিত ছয় ধরনের মশানাশকের পাঁচটির বিরুদ্ধে এডিস মশার প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মশা নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে। ‘মশা বাড়লে ওষুধ ছিটাও’— এই পদ্ধতির বদলে প্রয়োজন বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ভেক্টর ব্যবস্থাপনা। কোথায় কোন প্রজাতির মশা আছে, তার ঘনত্ব কত, কোথায় প্রজননস্থল বেশি, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কোথায় মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে— এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
গবেষণালব্ধ তথ্যকে মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপন্ন জ্ঞান কেবল গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতিনির্ধারণে কাজে লাগাতে হবে। কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ পরিবর্তন করতে হবে। মশাকে না বুঝে মশার বিরুদ্ধে লড়াই করে টেকসই সাফল্য পাওয়া যাবে না।
মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণকে স্বাস্থ্য বিভাগের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার, গবেষণা এবং নাগরিক দায়িত্বের বিষয়। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বহুতল ভবনের ছাদ, বেজমেন্ট, পার্কিং, নির্মাণাধীন ভবন ও প্রতিষ্ঠানের প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণেও সংশ্লিষ্ট মালিক ও কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একটি বাড়ির অব্যবস্থাপনা আশপাশের বহু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব মশা দিবস ক্যালেন্ডারের আরেকটি দিবস হয়ে না থাকুক। মশা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দিনটি হোক কার্যকর নীতি পরিবর্তনের উপলক্ষ। দিবস চলে যাবে, মশা থেকে যাবে— এমন চিত্র আমরা দেখতে চাই না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা