ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাজধানীর মানুষের চলাচল সহজ করেছে। এতে চেপে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এটি সাশ্রয়ী বাহন। অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এই বাহনকে ঘিরে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। তবে এর নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার এখন রাজধানীর জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অটোরিকশা। এর ব্যাটারির সিসা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করেছে। সময়ের আলোয় গতকাল এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া, পরিবর্তন বা পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার সময় পরিবেশে সিসা ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিষয়টি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে গ্যারেজ ও চার্জিংকেন্দ্রের আশপাশের মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এ ঝুঁকি আরও বেশি।
রাজধানীতে কত অটোরিকশা আছে তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই। মালিক সমিতির দাবি, শুধু ঢাকা শহরেই অটোরিকশার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য গ্যারেজ ও ব্যাটারি চার্জিং পয়েন্ট। অভিযোগ আছে, রাজধানীতে ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জে প্রতিদিন কী পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় সেটা একটা প্রশ্ন।
এটা ঠিক যে অটোরিকশার বদৌলতে অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন খাতের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বেশি নগদ আয়ের আশায় অটো চালাচ্ছেন। অটো চালানোর এই ঝোঁকের কারণে কৃষি ও উৎপাদন খাতে শ্রমিকের সংকট তৈরি হয় কি না সেটা ভাবনার বিষয়।
সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অটোরিকশা এখন অলিগলি ছেড়ে রাজপথে উঠে পড়েছে। কোথাও কোথাও এ কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। বেপরোয়া চলাচলের কারণে দুর্ঘটনাও ঘটে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এর চালক-মালিকরা সড়ক অবরোধ করেন। কয়েকটি দাবিতে গত সোমবার রাজধানীর প্রেস ক্লাবের সামনে সড়ক অবরোধ করে বাংলাদেশ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। তখন সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।
চালক-মালিকদের সব দাবিকে এককথায় অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। কেউ যদি বৈধভাবে ব্যবসা করেন তা হলে তাকে হয়রানি করা সংগত নয়। চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট রুটে অটোরিকশা চলার অনুমতির দাবিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে বৈধতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। অবৈধ গ্যারেজ, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
অটোরিকশার প্রশ্নে একটি সমন্বিত নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। রাজধানীর কোন সড়কে অটোরিকশা চলবে, কোথায় চলবে না— সেটি নির্দিষ্ট করতে হবে। প্রতিটি অটোরিকশার নিবন্ধন ও চালকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে অটোরিকশার গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এসব বাহনের ব্যাটারি কোথায় চার্জ হবে সেটিও ঠিক করতে হবে। পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহারের জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ব্যাটারির সিসা যেন মাটি, পানি ও বাতাসে না মেশে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, অটোরিকশা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত। রাজধানীবাসীর সাশ্রয়ী যাতায়াতের প্রশ্নও রয়েছে। আবার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই অটোরিকশা চলতে দিলে রাজধানীর সড়কের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় অটোরিকশার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। রাজধানী যেন অটোর ভারে ন্যুব্জ হয়ে না পড়ে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি