মুদ্রাস্ফীতি : সংসারের হিসাব যখন মেলে না

সিনথিয়া ইসলাম খুশবু

মতামত

সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেই একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু জাতীয় আয় বা

2026-10-07T04:11:24+00:00
2026-10-07T04:11:24+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
মুদ্রাস্ফীতি : সংসারের হিসাব যখন মেলে না
সিনথিয়া ইসলাম খুশবু
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেই একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু জাতীয় আয় বা মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সুযোগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তার ওপরও দেশের উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র নির্ভর করে। কিন্তু সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি মানুষের এই স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে, যেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সংখ্যা বেশি, সেখানে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে না বাড়ায় সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক পরিবারের কাছে মাসের আয় দিয়ে মাসের প্রয়োজন মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস চাকরি, শ্রম, ছোট ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা দৈনিক ও মাসিক মজুরি। তাদের আয় সাধারণত নির্দিষ্ট বা সীমিত। অন্যদিকে বাজারদর অনেক দ্রুত পরিবর্তিত হলেও তাদের বেতন বা মজুরি একই হারে বাড়ে না। ফলে কয়েক বছর আগে যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার স্বাভাবিকভাবে মাসের বাজার করতে পারত, বর্তমানে একই অর্থ দিয়ে সেই পরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব হয় না। একজন চাকরিজীবী বা শ্রমজীবী মানুষের আয় যদি বছরে সামান্য বাড়ে, কিন্তু একই সময়ে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংস, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি বেড়ে যায়, তা হলে বাস্তবে তার জীবনযাত্রার মান উন্নত না হয়ে বরং কমে যায়।

মুদ্রাস্ফীতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে মানুষের সঞ্চয়ের ওপর। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই ভবিষ্যতের প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে সেই সঞ্চিত অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকার পরিমাণ একই থাকলেও সেই টাকা দিয়ে ভবিষ্যতে আগের মতো পরিমাণ পণ্য বা সেবা কেনা সম্ভব হয় না। ফলে সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়ি নির্মাণ, বিয়ে কিংবা জরুরি পরিস্থিতির জন্য যে অর্থ সঞ্চয় করা হয়েছিল, তার ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নিজেদের জমানো টাকা দৈনন্দিন খরচে ব্যবহার করতে শুরু করে। এতে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায় পরিবারের খাদ্যাভ্যাসে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে প্রথমেই অনেক পরিবার খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনে। আগে যে পরিবার নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফলমূল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনত, তারা অনেক সময় সেগুলোর পরিমাণ কমিয়ে দেয়। কেউ কেউ অপেক্ষাকৃত সস্তা খাবারের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হয়। ফলে খাদ্যের পরিমাণ হয়তো কোনোভাবে বজায় থাকে, কিন্তু খাদ্যের গুণগত মান ও পুষ্টিমান কমে যায়। বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও বয়স্কদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

মুদ্রাস্ফীতির চাপ শুধু খাদ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের বাসস্থান ও জীবনযাপনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যাতায়াত ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সেবার খরচ বেড়ে গেলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে নিজেদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করতে হয়। 

অনেকে অপেক্ষাকৃত ছোট বাসায় চলে যায়, শহরের কেন্দ্র থেকে দূরের এলাকায় বসবাস শুরু করে কিংবা পরিবারের প্রয়োজনের তুলনায় কম সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থান বেছে নেয়। নিম্নবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাদের অনেকেই কম ভাড়ার জন্য ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হয়, যেখানে পর্যাপ্ত পানি, পয়োনিষ্কাশন, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাব থাকতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
মুদ্রাস্ফীতির কারণে শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও পরিবারগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। 

সন্তানের স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত ও অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ বেড়ে গেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অনেক পরিবার সন্তানের অতিরিক্ত শিক্ষা, কোচিং বা অন্যান্য শিক্ষামূলক কার্যক্রমের খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। 

একই ভাবে চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে গেলে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দেন বা সরকারি ও অপেক্ষাকৃত কম খরচের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করেন। এভাবে মুদ্রাস্ফীতি শুধু বর্তমান জীবনযাত্রাকে কঠিন করে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে মুদ্রাস্ফীতির ফলে আয় ও সম্পদের ওপর প্রভাব শ্রেণিভেদে ভিন্ন হয় এবং সম্পদশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে নিজেদের সম্পদের মূল্য সমন্বয় করতে পারেন, যা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের পক্ষে সম্ভব হয় না। একজন ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিক্রয়মূল্য সমন্বয় করতে পারেন, কিন্তু একজন নির্দিষ্ট বেতনের কর্মচারী প্রতিদিন নিজের বেতন বাড়াতে পারেন না। এই পার্থক্যই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপকে আরও তীব্র করে তোলে।

মুদ্রাস্ফীতির ফলে শ্রমিক ও কর্মচারীদের মজুরি যদি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে না বাড়ে, তা হলে তাদের প্রকৃত আয় কমে যায়। কাগজে-কলমে একজন মানুষের বেতন হয়তো আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু সেই বেতন দিয়ে যদি আগের তুলনায় কম পণ্য কেনা যায়, তা হলে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আসলে কমেছে। 

এ অবস্থায় মানুষকে প্রয়োজন ও চাহিদার মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। আগে যে বিষয়গুলোকে প্রয়োজনীয় মনে করা হতো, সেগুলোর কিছু বাদ দিতে হয়। বিনোদন, ভ্রমণ, পোশাক, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা অন্যান্য অপেক্ষাকৃত কম জরুরি ব্যয় কমিয়ে পরিবারগুলো শুধু মৌলিক প্রয়োজন পূরণের দিকে মনোযোগ দেয়। ফলে জীবন হয়ে ওঠে অনেক বেশি হিসাবনির্ভর ও সংকুচিত।

মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব মানসিক জীবনেও পড়ে। সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পারা, মাসের শেষ দিকে অর্থের সংকট, সন্তানের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারা, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা— এসব কারণে মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। আগে যে পরিবার সামান্য সঞ্চয় করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে পারত, তারা অনেক সময় মাসিক খরচ মেটাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও প্রভাব বিস্তার করে।

এই পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসার জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। সম্ভব হলে একমাত্র আয়ের উৎসের ওপর নির্ভর না করে অতিরিক্ত আয়ের পথ তৈরি করা, ছোট পরিসরে বৈধ ব্যবসা বা উদ্যোগ গ্রহণ, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে শুধু ব্যক্তির উদ্যোগ দিয়ে মুদ্রাস্ফীতির মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য সরকারের কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানুষের আয় ও মজুরি বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করা দরকার।

মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো— মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া এবং ধীরে ধীরে তাদের জীবনযাত্রার মান সংকুচিত করে ফেলা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর, কারণ তাদের আয় সীমিত এবং ব্যয়ের বড় অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে চলে যায়। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত সুফল তখনই মানুষের কাছে পৌঁছাবে, যখন সাধারণ মানুষ স্বচ্ছন্দে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে। 

তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনীতির স্বার্থে নয়, মানুষের স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত জরুরি। মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা— এটাই হতে পারে একটি স্থিতিশীল ও জনবান্ধব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   মুদ্রাস্ফীতি  সংসার  হিসাব  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: