মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বিএনপির মহাসচিব নন; তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। ২০ আগস্ট, ২০২৬ জাতীয় সংসদ সংসদের ভোটে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
এই নির্বাচন তাই শুধু একজন রাজনীতিকের নতুন পদে অভিষেক নয়; এটি মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সূচনা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার ভদ্রতা, সংযত আচরণ ও রাজনৈতিক পরিশীলনের স্বীকৃতি রয়েছে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির কঠিন সময়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থেকেছেন, নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং দলের রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তার সামনে প্রশ্নটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি কি বিএনপির রাষ্ট্রপতি থাকবেন, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাফল্য-ব্যর্থতার প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠবে। কেননা রাজনীতিকের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু দল। রাষ্ট্রপতির পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্র।
একজন দলীয় নেতা তার দলের পক্ষে অবস্থান নেন, দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছে দলীয় সমর্থক ও বিরোধী- উভয়েই দেশের নাগরিক। তার দায়িত্বের কেন্দ্র হওয়া উচিত সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকের সমান মর্যাদা।
মির্জা ফখরুলের জন্য তাই সবচেয়ে বড় কাজ হবে নিজের রাজনৈতিক অতীতকে মুছে ফেলা নয়; বরং তার ঊর্ধ্বে উঠে একটি নতুন সাংবিধানিক পরিচয় নির্মাণ করা। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তার যে রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সেটি সাংবিধানিক আনুগত্যে রূপান্তর করতে হবে।
এটি একটি কঠিন রূপান্তর। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তার সামনে একটি বড় ঐতিহাসিক সুযোগও। মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত সৌজন্য তার শক্তি। কিন্তু রাষ্ট্রপতির জন্য শুধু সজ্জন হওয়া যথেষ্ট নয়। সজ্জনতা ব্যক্তিগত গুণ। নিরপেক্ষতা সাংবিধানিক দায়িত্ব। একজন সজ্জন মানুষ ভিন্নমতকে সম্মান করতে পারেন। একজন রাষ্ট্রপতিকে নিশ্চিত করতে হয়- রাষ্ট্রও যেন ভিন্নমতকে সম্মান করে। একজন সজ্জন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে উদার হতে পারেন। একজন রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আচরণে ন্যায়-সমতার নিশ্চয়তা দিতে হয়।
তাই মির্জা ফখরুলের সামনে এখন শুধু ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার প্রশ্ন নেই। তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি একজন সাংবিধানিক রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন কি না। মির্জা ফখরুলের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত বিরোধী দলের সঙ্গে নয়Ñ নিজের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় এমন অনেক পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্বার্থ এক জায়গায় নাও থাকতে পারে। তখন তিনি কী করবেন? নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের প্রত্যাশা পূরণ করবেন, নাকি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেবেন?
দলের কোনো সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হলে তিনি কি রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন? কোনো নাগরিক বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী সরকারের সমালোচনা করলে তিনি কি সেটিকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখবেন? কোনো সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়লে তিনি কি প্রয়োজনীয় দূরত্ব ও দৃঢ়তা দেখাবেন?
এই জায়গাতেই তার প্রকৃত পরীক্ষা। কারণ রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় তখনই, যখন নিজের রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের দূরত্ব তৈরি হয়। সর্বজনের রাষ্ট্রপতি হওয়া মানে সবার মন জুগিয়ে চলা নয়। বরং সবার জন্য একই সাংবিধানিক মানদণ্ডে দাঁড়ানো।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক দলের যিনি সমর্থক নন, তার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, যিনি তার রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করেন, তার অধিকারও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির কাছে সরকার ও বিরোধী দল, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু, ক্ষমতাবান ও প্রান্তিক- সবাই রাষ্ট্রের নাগরিক। এই সমতার জায়গাটি রাষ্ট্রপতির আচরণে দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ, সাক্ষাৎ, সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক ভূমিকা এবং জনসমক্ষে তার প্রতিটি অবস্থান থেকে যেন বোঝা যায়- তিনি কোনো দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় বিভাজন দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্বল করেছে। এই বাস্তবতায় মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সৌজন্য একটি সম্পদ হতে পারে।
তিনি যদি রাষ্ট্রপতি ভবনকে রাজনৈতিক দূরত্ব কমানোর একটি জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, যদি বিরোধী মতের মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের সংস্কৃতি তৈরি করেন, যদি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও নাগরিক যোগাযোগে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন- তা হলে তার রাষ্ট্রপতিত্ব একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে।
রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তখন ক্ষমতা নয়, আস্থা। মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন একভাবে হবে; রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মূল্যায়ন হবে অন্যভাবে।
একজন দলীয় নেতা হিসেবে তার সাফল্য মাপা হয় দলকে কতটা সংগঠিত করেছেন, রাজনৈতিক সংগ্রামে কতটা কার্যকর ছিলেন কিংবা দলের স্বার্থ কতটা ক্ষমা করেছেন- এসব দিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সাফল্য মাপা হবে ভিন্ন মানদণ্ডে। দেখা হবে, তিনি কি রাষ্ট্রের সব নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন?
তিনি কি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়েছেন? তিনি কি নিজের দলের কাছেও প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক দূরত্ব বজায় রাখতে পেরেছেন? তিনি কি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষায় সমান সংবেদনশীল ছিলেন? তিনি কি এমন একটি রাষ্ট্রপতি পদ রেখে যেতে পারবেন, যার দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতিরা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুপ্রেরণা পাবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ভবিষ্যতে তার রাষ্ট্রপতিত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন তৈরি করবে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন তাকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগটি তাকেই তৈরি করতে হবে। তিনি চাইলে তার দলীয় অতীতই তার রাষ্ট্রপতিত্বের প্রধান পরিচয় হয়ে থাকতে পারে। আবার তিনি চাইলে সেই অতীতকে অতিক্রম করে একটি নতুন পরিচয় নির্মাণ করতে পারেন- সবার রাষ্ট্রপতি, সংবিধানের রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি।
এ জন্য তাকে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে সাংবিধানিক আনুগত্যকে স্থাপন করতে হবে। তাকে দেখাতে হবে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে- বিএনপির কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে বিএনপির সমালোচক, বিরোধী দলের নেতাকর্মী এবং রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত। তার সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি রক্ষার নয়; রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠনের।
মির্জা ফখরুল সজ্জন- এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন তাকে তার চেয়েও বড় কিছু হতে হবে। সজ্জনের গণ্ডি পেরিয়ে তাকে সর্বজনের রাষ্ট্রপতি হতে হবে। এটাই তার প্রতি সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাসও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এই প্রশ্নেই বিচার করবে- বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে তিনি কি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠতে পেরেছেন? তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দলকে প্রতিনিধিত্ব করা নয়; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্ব করা।
বিএনপির মহাসচিব ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তার রাজনৈতিক ভূমিকারও মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সাফল্যের মাপকাঠি হবে- তিনি কতটা নিরপেক্ষ, সংবিধাননিষ্ঠ এবং দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রের সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
দলের বৃত্ত পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা সমুন্নত রাখাই হবে তার প্রকৃত পরীক্ষা। বিএনপির রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কতটা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন- ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে সেই মাপকাঠিতেই বিচার করবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে