গভীর সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের রফতানি আদেশ কমেছে। ব্যাংকঋণের সুদ বেড়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (এলসি) খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। একাধিক সংকটে জর্জরিত শিল্প খাতের উৎপাদন কমছে। অনেক শিল্প-কারখানা সাময়িক বন্ধ হয়ে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। শিল্পমালিকদের সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং এবং গ্যাসের নিম্নচাপ উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করছে। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এ কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। গ্যাস-বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ও এলপিজি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলার না পাওয়ায় তুলা, সুতা, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামালের অভাবে ৩৫ শতাংশ স্পিনিং মিলের সক্ষমতা অর্ধেক কমেছে। উচ্চ সুদহার শিল্প খাতের সংকটকে আরও তীব্র করছে। অনেক ব্যাংকে ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। যে কারণে কার্যকরী মূলধনের ব্যয় বেড়েছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
গার্মেন্টস খাতে গত বছরের তুলনায় নতুন অর্ডার কমেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। সময়মতো ক্রেতাদের পণ্য পাঠাতে না পারার খেসারতও গুনতে হচ্ছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো যাচ্ছে না।
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের উৎপাদন কমেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। ৫০০টির বেশি কারখানা লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে। চামড়ার রফতানি কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল খাতে প্রায় ৪০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিল্প খাতের এই দুরবস্থার অভিঘাত পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রফতানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পের উৎপাদন ও রফতানি কমলে ডলার আয় কমবে। তখন রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। শিল্প খাতে কাজ করেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। উৎপাদন কমে যাওয়ায় ওভারটাইম বন্ধ হয়েছে। অনেক শ্রমিকের মাসিক আয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা কমেছে। গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে ছাঁটাই শুরু হয়েছে।
সরকারও সংকটের গভীরতা অনুধাবন করছে। পরিস্থিতে মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু পরিকল্পনা করাই যথেষ্ট নয়। পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। মোট সরবরাহের ৬২ শতাংশই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করে শিল্পে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবসম্মতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
শিল্প খাতের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে একটি সমন্বিত পুনরুদ্ধার কৌশল প্রয়োজন। গ্যাস-বিদ্যুৎ, ডলার, ঋণের সুদ, আমদানি, রফতানি, কর-শুল্ক ও বিনিয়োগনীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে শিল্পকে সচল রাখা জরুরি। শিল্পের চাকা সচল রাখা গেলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ পাবে।
সময়ের আলো/এসএকে